“মহারাজ, আপনি সঙ্গে একটা চটের থলি কেন নিয়েছেন?” মন্ত্রী বগলাচরণ ফিসফিসিয়ে চাপা গলায় প্রশ্ন করতেই রাজা নেপালচন্দ্র চটে গিয়ে কটমট করে তার দিকে চেয়ে বলেন, “রানির নিজের হাতে রঙিন সুতোর কাজ করা এতো সুন্দর কাঁধে ঝোলা ব্যাগকে কেউ চটের থলি বলে? বুদ্ধিশুদ্ধি কি একেবারেই লোপ পেয়েছে?”
মন্ত্রী খানিক অপ্রস্তুত হন, “ক্ষমা করবেন, ওটা যে রানির তৈরি সেটা জানা ছিলনা। কিন্তু ওর মধ্যে আছে কি?”
রাজা ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেন, “এ ঝুলি তেমন ভারি নয়, একটা পেন্সিল টর্চ, কিছু স্বর্ণমুদ্রা ছাড়া সামান্য কিছু শুকনো খাবার আছে, পথে প্রয়োজন হলে কাজে লাগবে। পেট খালিখালি লাগলে আমার বড়ো অসুবিধে হয়। এখন আর কথা নয়, এবার বের হতে হবে।”
মন্ত্রী আগেই আন্দাজ করেছিলেন থলে নেওয়ার কারণ তবুও ইচ্ছে করেই প্রশ্ন করে নিশ্চিত হতে চাইছিলেন, নেপালচন্দ্রের দিকে চেয়ে বলেন, “আবার খাবারদাবার নিলেন? রাতে তো ভালোভাবেই আহার করেছেন, এরমধ্যে খাওয়ার কথা আসছে কেন, সেটাও বুঝছি না। একদিনের তো ব্যাপার! সর্বক্ষণ এতো খাই খাই করলে খুব মুশকিল!”
রাজামশাই গম্ভীর স্বরে বলেন, “খিদে পেলে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, সেটা নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়, তাছাড়া খিদে তেষ্টা মেটানোর জন্য রাস্তার ধারে কেউ খাবার নিয়ে অপেক্ষা করবে কি!”
মন্ত্রীমশাই মাথা নেড়ে বলেন, “আশেপাশে কোনো রাজ্যের পথের ধারে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণের রীতি এখনো পর্যন্ত চালু হয়েছে সেরকম কোনো সংবাদ কানে আসেনি তবে দোকানপাট নিশ্চয়ই আছে, অর্থ দিলেই খাদ্যবস্তুও নিশ্চয়ই পাওয়া যায়।”
“আর কথা নয়, অযথা দেরি করে লাভ নেই।” রাজামশাই ফটক খোলেন।
এতোক্ষণ রাজপ্রাসাদের ভেতরে ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে রাজা আর মন্ত্রী চাপা স্বরে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন।
আনন্দপুর রাজ্য এখন নি:ঝুম, ঘুমের অতল তলে! এ রাজ্যে পাখির ডাকেই সবার ঘুম ভাঙে, সূর্যাস্তের খানিক পরেই ঘুমের তোড়জোড় শুরু হয়। হেথায় প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থান।
রাজা নেপালচন্দ্র আর মন্ত্রী বগলাচরণ ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদ থেকে বের হয়ে আসেন, সঙ্গে দুজনের নিজস্ব প্রিয় ঘোড়া। আজন্ম একসাথে বেড়ে ওঠা দুই বন্ধু রাজা আর মন্ত্রীর পদে বসলেও স্বভাবের বদল হয়নি, প্রাণের অকৃত্রিম সখ্যতা আজও প্রগাঢ়। রাজপ্রাসাদ থেকে দুজনে রাজপথে নামতেই রানি রূপমতী নিজের শয়নকক্ষের শয্যা ছেড়ে নি:শব্দ চরণে বেরিয়ে এসে ফটকের দরজায় চাবি দিয়ে রাজার শয়নকক্ষের দরজা ভেজিয়ে আপন কক্ষে ফিরে শয্যায় শুয়ে পড়েন। রাজ্যের খুঁটিনাটি সব ব্যাপারেই মন্ত্রী রানিকে আগাম জানিয়ে রাখেন, প্রয়োজন হলে শলাপরামর্শ করেন। রাজপ্রাসাদের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারস্যাপার হলে রানিও বুঝেশুনে খাবার, পোশাক, দরকারী অন্য জিনিসপত্র এমনভাবে সাজিয়েগুছিয়ে রাখেন যাতে রাজামশাই সেসব অনায়াসেই হাতের কাছে পেয়ে যেতে পারেন। এসবই রাজার অগোচরে এবং মন্ত্রী ও রানির গোচরেই হয়। পাছে রানি বাধা দেন তা-ই রাজামশাই ভ্রমণের ব্যাপারে রানিকে জানাতে চান না। প্রথম থেকেই রাজামশাইয়ের এই বালখিল্য আচরণ রানি উপভোগ করেন। একমাত্র রানি-ই আনন্দপুর রাজ্যের সব ব্যাপারেই ওয়াকিবহাল, খবরাখবর জোগান দেওয়ার ব্যাপারে রূপমতীর বেশ কিছু বিশ্বস্ত লোকজন আছে। বলতে গেলে, এ রাজ্যের হাল রূপমতীরই হাতে, তার সুচারু ব্যবস্থাপনায় আজও সব সঠিকভাবে চলে।
রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে রানির সাথে দাসদাসীরাও মিলেমিশে এক পরিবারের মতো থাকে। আনন্দপুর রাজ্যের রাজপ্রাসাদে কখনোই সেরকম জমকালো জাঁকজমক ছিলনা, যা কিছু অনুষ্ঠান, সবই প্রজাদের নিয়ে। রাজ্যাভিষেকের দিন প্রজারা রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে একসাথে হৈহৈ করে নাচগান করে পাত পেড়ে খাওয়াদাওয়া সারে। প্রজাদের সেরকম বিশেষ কিছু গুরুতর অভিযোগ থাকেনা বলে রাজা নেপালচন্দ্র প্রতিদিন রাজসভায় উপস্থিত হতে চান না। তখন প্রজারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে অনেক ভেবেচিন্তে অভিযোগ জানাতে আসে। তাই আজও সিংহাসন ঝেড়ে পুঁছে রাখতে হয়, নেপালচন্দ্রকে নিয়মিত রাজসভায় গিয়ে প্রজাদের অভাব অভিযোগ শোনার জন্য অপেক্ষাও করতে হয়। অকারণ যুদ্ধে অনিচ্ছুক বলে আশেপাশে রাজাদের সাথে মিত্রতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, মাঝেমধ্যেই জিনিসপত্রের আদানপ্রদানের সাথেসাথে পরস্পরের রাজ্যে যাতায়াত হয়। রাজামশাইয়ের পূর্বপুরুষদের আদ্যিকালের জঙ ধরা অস্ত্রশস্ত্রের মরচে তুলতে মাঝেমাঝে সেসব তেল দিয়ে পালিশও করতে হয়। অবসরে রানিমা পুরনো রাজপোশাক সযত্নে রিপু করে সাবধানে রোদ্দুরে দিয়ে দেরাজে তুলে রাখেন। দর্জিকে ডেকে মাপজোখ দিতে বললেই রাজামশাই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেন, রাজসভা ছাড়া রাজপোশাক গায়ে দিতে রাজার ঘোরতর আপত্তি। অন্য রাজ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এ রাজ্য তার নিজস্ব পুরাতন নিয়মেই চলে, সুখেদুখে সবাই মিলেমিশে থাকে। এসবের মধ্যেই রাজা আর মন্ত্রী মাঝেমাঝে ছদ্মবেশে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন।
আজকেও রাজপথে নেমে নিজের প্রিয় সাদা রঙের ঘোড়ার পিঠে চড়ে তার গলার কাছে আদুরে হাতের ছোঁয়া দিয়ে রাজা নেপালচন্দ্র বললেন, “চল রে তুফান, উত্তর দিকে।”
মন্ত্রী, বগলাচরণও তার বাদামী আর সাদা ছোপ ছোপ ঘোড়ার পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, “বাদামী, বহু বছর পরে অন্য রাজ্যে যাবো। অনেকটা পথ, ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেবো, এখন এগিয়ে চল।”
দুই সওয়ারীকে নিয়ে দুরন্ত গতিতে তুফান আর বাদামী টগবগিয়ে ছুটে চলে। বিশাল রাজ্যের রাজপথ ছেড়ে জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পায়েচলা পথ ধরে যেতে-যেতে মাঝেমধ্যে থমকে দাঁড়ায়। ঝকঝকে আকাশে চাঁদের বুড়ি চরকা কাটা বন্ধ করে নিচের দিকে তাকিয়ে ফোকলা গালে হাসতেই চাঁদের রূপোলী আলো ঝিলমিল করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যাতারার তখন সামান্য একটু ঝিমুনি এসেছিল, চাঁদের বুড়ি তার কাছে গিয়ে ঠেলা দেয়, “ওলো মেয়ে, এখন কি ঘুমোতে আছে? নিচের পানে ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখ, দু’জনে টগবগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে, তুই আলোর পিদিম না জ্বাললে পথ ভুল করবে।”
সন্ধ্যাতারা লজ্জা পেয়ে চোখ কচলে ঝিকমিকিয়ে ওঠে, “শুক্লপক্ষের আকাশ জুড়ে হাজার তারা রোশনাই দিচ্ছে আর আকাশে উত্তর দিকে ধ্রুবতারা তো একভাবে জ্বলজ্বল করছে, তেমন অসুবিধে হবেনা। আসলে সেই সন্ধ্যেতে পশ্চিম আকাশে এসে একভাবে ডিউটি করতে করতে একটুখানি চোখ লেগে গিয়েছিল। তুমি বরং চাঁদমামার ঘরে ঢুকে খানিক বিশ্রাম নিতে যাও, আমার তন্দ্রা কেটে গিয়েছে।”
চাঁদের বুড়ি হাসিমুখে বলে, “আর খানিক সূতো কেটে মায়াজাল তৈরি করে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দিই! সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে রাতের ঘুমে সব স্বপন দেখুক।”
এদিকে নেপালচন্দ্র আর বগলাচরণ রাজ্যের সীমানায় এক সুরঙ্গের সামনে এসে দুই ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দেন। বগলাচরণ আগে থেকে সেই জায়গায় তুফান আর বাদামীর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে দানাপানির সুব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। প্রশিক্ষিত দুই ঘোড়া এ রাজ্যের ভেতরে কাছেদূরে যেখানেই যাক, রাজা-মন্ত্রীর ফেরার সময় হলেই সঠিক জায়গায় চলে আসে। পশুপাখি তো আগাম খবর পায়, প্রকৃতি তাদের আগেভাগেই সজাগ করে দেয়। বাতাস জীবজন্তু, মানুষের গন্ধ ছড়িয়ে দেয়, দিনের সুর্য আর রাতের তারার মায়ায় ঘেরা চাঁদের আলো জীবদের অবয়ব স্পষ্ট করে।
বাদামীর পিঠে হাত রেখে খানিক দাঁড়িয়ে সুরঙ্গের মুখে এসে বগলাচরণ গুপ্ত দরজা খুলে নেপালচন্দ্রের হাত ধরে আবারও পদব্রজে অগ্রসর হন। গভীর রাতে দু’জনে ঝিমঝিমপুরে প্রবেশ করতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। রাতদুপুরেও সে রাজ্যে নিস্তব্ধতার বদলে লোকজন, হৈহল্লা, আলোয় উৎসব মুখর।
নেপালচন্দ্র অবাক হয়ে যান, “এ রাজ্যের নাম তো ঝিমঝিমপুর, কিন্তু কেউ তো ঝিমোচ্ছে না! এতো রাতেও রাজপথে এতো মানুষ কেন? রাতে এ রাজ্যের মানুষজন ঘুমোয় না বুঝি! নাকি আজ কোনো বিশেষ দিন!”
“কি জানি! আমিও তো কিছু বুঝতে পারছি না!” বগলাচরণও হতবাক হয়ে যান।
রাজা হলে কি হবে! নেপালচন্দ্র বরাবরই ভিতুর ডিম। বগলাচরণের কানেকানে ফিসফিসিয়ে বলেন, “যদি হয় কিছু ঝামেলা, তার চেয়ে মানে মানে সময় থাকতে নিজভূমে ফিরে চল বগলা!”
বগলাচরণ নেপালচন্দ্রের দিকে ফিরে চোখ পাকান, “এইজন্য, শুধুমাত্র এইজন্যই তোকে দেখলে পিত্তি চটকে যায়! উনি হয়েছেন মহারাজ! ফু:! অজানা জায়গায় নাম ধরে কেউ ডাকে? ডাক নামে ডাকলে আর ছদ্মবেশ ধরার মানে কি? কবে যে আর বুদ্ধি হবে?”
নেপালচন্দ্র চুপচাপ মন্ত্রীর বকুনি ঢোঁক গিলে হজম করে নেন, তারপর কাঁধের ঝোলা থেকে স্টিলের টিফিনবাক্স খুলে একসাথে দু-তিনটে তিলের নাড়ু মুখে পুরে চিবোতে শুরু করে দেন, পেটে খাবার পড়লেই রাজামশাইয়ের ভয় কেটে যায়। বগলাচরণও সেদিকে আড়চোখে চেয়ে হাত বাড়িয়ে দেন, নেপালচন্দ্র একখানা নাড়ু মন্ত্রীর হাতে দিয়ে টিফিনবাক্স ঝোলায় ঢোকান।
“একযাত্রায় পৃথক ফল! ঠিক নয়।” বগলাচরণ নাড়ু খেতে খেতে এগিয়ে চলেন।
সামনেই আলো ঝলমলে রাজপ্রাসাদের বাইরের মহলের বিরাট চত্বরে প্রচুর মানুষ জমায়েত হয়েছে, ফটক খোলা থাকায় নেপালচন্দ্র আর বগলাচরণও সেখানে গিয়ে হাজির হন।
ভিড় ঠেলে কিছুটা এগিয়ে যেতেই দেখা যায়, সে-ই চত্বরে অগুনতি বড়ো বড়ো পেতলের হাড়ি, গামলা রাখা আছে যার বেশিরভাগই ফাঁকা, বেশ কয়েকটায় ধবধবে রসগোল্লা রসে টইটম্বুর হয়ে ভাসছে।
বগলাচরণ নেপালচন্দ্রের কানে কানে বলেন, “মনে হচ্ছে আহার প্রতিযোগিতা চলছে।”
বেশ কিছু প্রতিযোগী এঁটো হাতেই মার্বেল পাথরের মেঝেতে শুয়ে পড়েছে। তাদের অনেকের ঊর্ধ্বাঙ্গে জামা নেই, আবার অনেকের গায়ে জামা বা ফতুয়া থাকলেও বোতাম খোলা,পরণের ধুতির খুঁট কোমরের কাছে আলগা করা। রাজপেয়াদারা এসে তাদের বুকে কান পেতে হৃৎপিন্ডের ধুকধুকানির শব্দ শুনে বেঁচে থাকা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে চ্যাংদোলা করে তুলে অন্যত্র রেখে আসছে। এখন কেবলমাত্র দুজন প্রতিযোগী বসে অতি ধীরে ধীরে রসগোল্লা গলাধঃকরণ করছে।
“আরে, এ শুধু রসগোল্লা খাওয়ার প্রতিযোগিতা!” লোভে নেপালচন্দ্রর জিভে জল চলে আসে।
পাশে দাঁড়ানো শ্যামলবর্ণ, বলিষ্ঠ চেহারার এক যুবক নেপালচন্দ্রের গলার আওয়াজে তার দিকে চেয়ে কোমল কন্ঠে বলে, “আপনি কি এ রাজ্যে নবাগত! রাজ্যবাসীরা সবাই তো বাৎসরিক এই মিষ্টি খাওয়ার প্রতিযোগিতার কথা জানে। অনেক প্রতিযোগী রীতিমত অসুস্থ হয়ে যায়। সন্ধ্যে সাতটায় শুরু হয়েছে এখন রাত দুটো! কি করে যে খায়! কেন যে খায়! এদের মানুষের নাকি হাতির পাকস্থলী তাও বুঝিনা। শেষপর্যন্ত কে যে টিঁকবে! ফটকে না মানকে!”
বগলাচরণ কৌতূহলী হন, “ফটকে আর মানকে বোধহয় ফটিক আর মানিক! তা এরা কি প্রতিবারই প্রতিযোগিতায় নাম দেয়? অনেকে টেঁকে না কেন? টেঁসে যায় বুঝি?”
যুবকটি খানিক চুপ করে থাকে, তারপর ছলছল চোখে রুদ্ধ কন্ঠে বলে, “টেঁসে একজনই গিয়েছিল। এরা সব নিয়মিত প্রতিযোগী, ফটিকের তো জিভে কোনো সাড় নেই। আর মানিক! সে তো আরেক কাঠি ওপরে, শুধুমাত্র এই প্রতিযোগিতায় জিতবে বলে প্রতিদিন নিয়ম করে পাঁচশোটা কাঁচা লঙ্কা চিবিয়ে খায়।”
“কেন? কাঁচা লঙ্কা কেন? রসগোল্লা খাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে কাঁচালঙ্কা খেতে হয় কেন?” নেপালচন্দ্র কৌতূহলী হন। বগলাচরণও আগ্রহী হন,” কোন জন টেঁসেছিল?”
যুবক বলে, “বুঝতে পারছি, আপনারা দু’জনে এরাজ্যের কোনো খবরই রাখেন না। আসলে এ রসগোল্লা বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়। আমার ঠাকুর্দা, বছর দশেক আগে বাবা আর ঠাকুমার সাথে রাগারাগি করে বাঘাকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যায়, খোঁজখবর নিয়ে পরে জানা যায়, এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে এ-ই রাজ্যে এসে পড়েছিল। বাড়ি ছেড়ে এদিকসেদিক ঘোরাঘুরি করে বেশ কদিন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া হয়নি তার ওপর পুরস্কারের লোভে প্রতিযোগিতার সব নিয়মকানুন ঠিকমতো না জেনেই প্রতিযোগিতায় নাম দেয়। এসব খবর বাড়ির কেউ জানতো না, মারা যাওয়ার অনেক বছর পরে লোকমুখে ঠাকুর্দার চেহারার বিবরণ শুনে বুঝেছিল। ওইরকম ডাকাবুকো মানুষ শেষকালে অপঘাতে মারা গিয়েছিল! এভাবে মরলে অপঘাতই হয়, তাই নয় কি! মৃতদেহ দাহ, শ্রাদ্ধশান্তি কিছুই করার উপায় ছিল না। আজও বাড়ির সবাই মরমে মরে আছে। বড় হয়ে সব শুনে প্রতি বছর এসময় এখানে ঠাকুর্দার ব্যাপারে সঠিক কিছু তথ্য পাওয়ার আশায় আসি। সারাবছর তো এ রাজ্যের মানুষ ঝিমিয়েই থাকে, এই রাতেই তেড়েফুঁড়ে ওঠে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সঠিক কিছু জানতে পারিনি, আসলে এরা নিজেরাও ঠিক জানে না।” এই পর্যন্ত বলেই সে-ই যুবক ফোঁসর ফোঁসর করে কাঁদতে শুরু করে।
নেপালচন্দ্রর মন বড্ড নরম, কান্না দেখে তারও চোখ ছলছল করে, যুবকের কাঁধে হাত রাখেন, “এতোগুলো বছর ধরে স্বজনের শোক বুকে রাখে যারা তারা সত্যিই হৃদয়বান। উনি নিশ্চয়ই স্বর্গে গিয়েছেন।”
“স্বর্গ! সে আবার কোন জায়গা! সেথায় যাওয়ার পথ জানা থাকলে তো যাবে! জীবনে অন্য কোথাও যায়নি, ওই একবারই গ্রাম থেকে বেরিয়ে কিভাবে যেন এখানে এসেছিল!” সহজসরল যুবকটি পরণের ধুতির কোঁচা দিয়ে চোখ মোছে।
বগলাচরণই সামাল দেন, “আমরা যদি কোনো সংবাদ পাই, নিশ্চয়ই জানাবো। এখন একদম কান্নাকাটি নয়।”
ঝিমঝিমপুরের রাজার লোক এসে ঢেঁড়াপেটা করে, “আজকে যে যত রসগোল্লা খেতে চাইবে তাকে সরবরাহ করা হবে।”
“বা:, বেশ তো। কোথায় গিয়ে চাইতে হবে?” রাজামশাইয়ের আর তর সয়না।
“প্রতিযোগিতার জয়ীর নাম ঘোষিত হলে এই চত্বরেই দেওয়া হয়।” লোকটির কথা শেষ হতে না হতেই দুই প্রতিযোগীর একজন ধপাস করে সশব্দে আঙিনায় শুয়ে পড়ে, তার বিশাল বপু ফুটবলের মতো উঁচু পেট নিয়ে স্থির হয়ে পড়ে থাকে।
উপস্থিত জনতা হৈহৈ করে ওঠে, “মানকে শুয়ে পড়েছে! ফটকে জিতেছে!”
রাজবাড়ির একতলার বারান্দা থেকে টিঙটিঙে চেহারার ঝলমলে পোশাক পরা বিশাল পাগড়ি মাথায় পাঁচ ফুট উচ্চতার একজন গমগমে গলায় ঘোষণা করেন, “এ বারের জয়ী ফটিক দাস, পুরস্কার যথাসময়ে তার গৃহে পৌঁছে যাবে। আজকের মতো অনুষ্ঠানের সমাপ্তি।”
“যিনি ঘোষণা করলেন, তিনি কে?” নেপালচন্দ্র যুবকটিকে জিজ্ঞেস করতে সে উত্তর দেয়, “উনিই তো ঝিমঝিমপুরের রাজা, ঝিঙ্কুটচন্দ্র।”
নেপালচন্দ্র আর বগলাচরণ ঝিঙ্কুটচন্দ্রর দিকে চেয়ে অবাক হয়ে যান। বগলাচরণ বলেন, “ছোটখাটো মানুষের এমন বাজখাঁই গলা!” তারপর সেই যুবককে প্রশ্ন করেন, “এ রাজ্যের রানি নেই?”
যুবকটি অবাক হয়ে বলে, “ওমা! রাজা থাকলে রানি থাকবে না! ওই তো নীল পাড় হলুদ ডুরের তাঁতের শাড়ি আর মাথায় কলকে ফুলের মুকুট পড়ে দোতলার বারান্দায় রানিমা দাঁড়িয়ে আছেন। আসলে উনি রাজার থেকে লম্বা বলে পাশাপাশি দাঁড়ান না।”
অপূর্ব সুন্দরী রানির সারা মুখে এক প্রগাঢ় বিষণ্ণতা, প্রতিযোগিতা শেষ হতেই তিনি উঠে অন্দরমহলে চলে যান।
নেপালচন্দ্র সেদিকে চেয়ে প্রশ্ন করেন,” রাজা-রানি কারুর মুখে স্বাভাবিক হাসি নেই কেন? প্রজারাও সব যেন দম দেওয়া পুতুলের মতো!”
“একমাত্র রাজকন্যা, রঞ্জাবতী প্রাসাদ থেকে চলে যাওয়ার পরেই এ রাজ্যের এই দশা হয়েছে।”
বগলাচরণ উৎসুক হন, “রাজকন্যা চলে গেলো কেন?”
“রঞ্জাবতী ছোটবেলা থেকেই সহজসরল জীবন পছন্দ করতো, রাজপ্রাসাদ তার কাছে জেলখানা মনে হতো। মাঝেমধ্যেই সবার অজান্তে ঘোড়া ছুটিয়ে একাই এদিকসেদিক চলে যেতো। একবার সেভাবেই বেরিয়ে ভিনদেশী এক যুবকের সাথে পরিচয় হয়, পরে গোপনে তাকে বিয়ে করে। বংশ কৌলিন্যে, আভিজাত্যে সেই যুবককে সমগোত্রীয় মনে না হওয়ায় বিয়ের সংবাদ রাজা ঝিঙ্কুটচন্দ্রর কানে এলে তিনি খুব রেগে যান। রানির অনুরোধ অগ্রাহ্য করে মা-মেয়েকে গৃহবন্দী করেন আর সে-ই যুবককে রাজ্য থেকে বের করে দেন। এরপর একদিন সুযোগ পেয়ে রঞ্জাবতী পালিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেই রাজা শোকে তাপে এরকম হয়ে গিয়েছেন। নিজেও ঠিক করে ঘুমোন না, কাউকে ঘুমোতেও দেন না। প্রজারা সর্বদা ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকে। রাজার খামখেয়ালিপনা আর উল্টোপাল্টা কাণ্ডকারখানার জন্য রানির মনেও কোনো আনন্দ নেই।” যুবকটি বেশ খবর রাখে বোঝা যায়।
রাজপেয়াদা ঢুলুঢুলু চোখে হাই তুলতে তুলতে জানায়, “এবারে যারা রসগোল্লা খেতে আগ্রহী তারা আসন গ্রহণ করবে।”
কিন্তু কেউ রসগোল্লা খেতে আগ্রহী নয়, সব ফিরে যাচ্ছে!
“এরা বুঝি কেউ খাবে না?” নেপালচন্দ্র ব্যাপারস্যাপার বুঝতে পারেন না।
এক বৃদ্ধ এতোক্ষণ এদের কথাবার্তা শুনছিল, সে এবার বলে, “এমনিতেই তো এ রাজ্যে ঘুমনো বারণ, বাড়ি গিয়ে ঝিমোতে হয়, বেশিরভাগ সময় ঝিমোতে ঝিমোতে সব ঘুমিয়েও পড়ে। যাতে কেউ জানতে না পারে, প্রজারাও তাই দরজা জানলার ফাঁকফোকর সব আগে থেকেই বন্ধ করে রাখে। তাও কি শান্তি আছে! ঘুমোতে ঘুমোতেই সব অকারণ চমকে চমকে ওঠে। রাজামশাই টের পেলেই সর্বনাশ, শাস্তিভোগ করতে হয় সাত দিন ধরে এই রসগোল্লা খেয়ে। আর এই রসগোল্লা খেলে আর ঘুমোনোর উপায় নেই। শুধু জল খেয়ে যেতে হয়! এ রাজ্যে ঝোপঝাড় থাকলেও নদী, ঝর্ণা নেই। জলের সমস্যা আছে। সাধ করে কে আর জ্বলেপুড়ে মরবে!”
সেই বুড়ো এবার মুচকি হেসে লাঠি নিয়ে ঠুকঠুক করে দুলকি চালে চলে যায়।
খানিকক্ষণ আগের সেই হৈচৈ এখন বন্ধ, চারপাশে নিঝুম স্তব্ধতা। নেপালচন্দ্র, বগলাচরণ আর সেই যুবক তখনো দাঁড়িয়ে ছিল। রাজপেয়াদা তাদের কাছে এসে খিকখিক করে হাসে, “তোমরা তিন জন রসগোল্লা খাবে বুঝি! খাওয়ার খুব সখ! তাহলে বসে বসে খাও, আমি চললুম,” কাছে দাঁড়ানো একজন পাচককে আদেশ করে, “এদেরকে যত্ন করে স্পেশাল রসগোল্লা খেতে দে।”
পাচক ঢুলুঢুলু চোখে তিন হাড়ি ভর্তি রসগোল্লা আর তিন গ্লাস জল সামনে রেখে যায়, “যত পারো খাও তবে জল আর নেই। সারাদিন ঘুমোইনি, আমিও যাই, একটু খোলা হাওয়ায় ঘুরে আসি, নইলে এখানেই ঘুমিয়ে পড়বো।”
বগলাচরণ নেপালচন্দ্রের হাতে চিমটি কাটেন, “এক্ষুনি এখান থেকে পালাতে হবে। কিছু একটা গন্ডগোল আছে নইলে রসগোল্লা ফেলে সব পালায়!”
খাওয়ার কথাতে নেপালচন্দ্রের বরাবরই প্রাণে আরাম আসে। বগলাচরণের কথায় কর্ণপাত না করে নেপালচন্দ্র এগিয়ে যেতেই বগলাচরণও বাধ্য হয়েই সঙ্গ নেন, “রাত্রিদিন এই ‘খাইখাই’ করেই আপনার অবস্থা হবে ‘যাই যাই’। বিদেশবিভুঁইয়ে এসে যত্রতত্র খাওয়াদাওয়া উচিত নয়।”
নেপালচন্দ্র ততক্ষণে আয়েস করে বসে হাড়ি থেকে খান চারেক রসগোল্লা একসাথে মুখে পুরে চিবোতে শুরু করেছেন, মন্ত্রীও কিন্তু কিন্তু করে একখানা নিয়ে মুখে পুরেছেন আর সেই মুহূর্তে দুজনেরই ব্রহ্মরন্ধ্র যেন অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠলো! সে-ই যুবক তখন রসগোল্লার এক কুচি মুখে পুরে বাকিটা ফেলে দিয়ে চুপ করে বসে আছে। নেপালচন্দ্র তখন জিভ বের করে “হ্যা”,”হু” শব্দ করছেন আর ঢকঢক করে গ্লাসের জল পান করছেন।
“জল চাই, জল।” নেপালচন্দ্রর দু চোখ দিয়ে টসটস করে জল গড়াচ্ছে, “এ কি রসগোল্লা! এ তো লঙ্কাগোল্লা! এরকম ঝাল রসগোল্লা জীবনে খাইনি। প্রতিযোগীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে কিভাবে খাচ্ছিল? আরও জল চাই, নইলে মরে যাবো।”
পাছে নেপালচন্দ্র তার গ্লাসের জলও পান করে ফেলে তাই যুবকটি তাড়াতাড়ি এক ঢোকে নিজের গ্লাসের জল শেষ করে উঠে পড়ে, “এইজন্যই থরহরি দাস মারা গিয়েছিল। আগেই বলেছিলাম ফটিকের জিভ অসাড় আর মানিক নিত্যি গাদাগুচ্ছের লঙ্কা খায়। থরহরি দাসের তো এরকম কোনো অভ্যেস ছিলনা। সত্যিকারের মিষ্টি রসগোল্লা ভেবেই অভুক্ত থরহরি দাস এই প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিল, তারপর বুঝেও চলে যেতে পারেনি। প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী যতক্ষণ না প্রতিযোগী শুয়ে পড়ছে, খেয়ে যেতে হবে। সবার সামনে প্রতিযোগিতার মাঝখান থেকে উঠতে লজ্জা পেয়ে জোর করে একশো খানা রসগোল্লা খেয়ে সেই যে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছিল আর ওঠেনি। তারপর তার মৃতদেহ কে যে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল আজও টের পাওয়া যায়নি। ঝিঙ্কুটচন্দ্রের লোকেরা তাকে কোথায় যে রেখেছিল কে জানে!”
“থরহরি দাস! সে আবার কে!” বগলাচরণ নিজের গ্লাসের জল আলগোছে সামান্য পান করে বাকিটা নেপালচন্দ্রর মুখে ঢেলে দেন।
“নরহরি দাসের ঠাকুর্দা!”
“নরহরি-ই বা কে?”
“সাত কান্ড রামায়ণ শুনে এখন জিজ্ঞেস করছেন সীতা কে? আমার ঠাকুর্দার নাম থরহরি, এবারে বুঝলেন তো আমি নরহরি। পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট গ্রাম, আকাশকুসুম, সেখানেই আমার বাড়ি। পায়ে হেঁটে হেথায় এসে এক খানা রসগোল্লার এক্টুসখানি খেয়ে ঠাকুর্দার আত্মার শান্তি কামনা করে বাড়ি ফিরে যাই। মা, বাবা, ঠাকুমা আমার ফেরার অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে থাকে।”
“থরহরির সঙ্গী বাঘা, তার খোঁজ পেলেই তো হতো!” নেপালচন্দ্র জিভ বের করেই গোয়েন্দার মতো প্রশ্ন করেন, “থরহরি তো বাঘাকে সঙ্গে নিয়ে ঘর ছেড়েছিল!”
“বাঘারও খোঁজ পাওয়া যায়নি। দু’জনেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে।” নরহরি উঠে দাঁড়ায় তারপর দ্রুত পায়ে ফটক পেরিয়ে চলে যায়। বগলাচরণ নেপালচন্দ্রের হাত ধরে হেচকা টান দিয়ে হিড়হিড় করে টেনে বাইরে নিয়ে আসেন, “একমুহূর্তও আর এখানে নয়।”
উত্তরের আকাশে ধ্রুবতারা জ্বলজ্বল করে তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। চাঁদের বুড়ি এখন গাঢ় ঘুমে, কিছুক্ষণ আগেই একটুকরো মেঘ এসে ধ্রুবতারার কানে ফিসফিস করে বলে গিয়েছে, “বুড়ির এতো বয়েস হলো তাও নিত্যি সুতো কেটে মায়াজাল তৈরি করা চাই। খানিক আগে ঘুমিয়েছে, ঘুম যাতে না ভাঙে সে ব্যবস্থা করি।” সেই মেঘ চাঁদমামার ঘরের সামনে চাঁদের বুড়ির মুখে আড়াল দিতে পর্দা হয়ে ভেসে থাকে। ধ্রুবতারা মনেমনে বলে, “আমার হয়েছে যত জ্বালা! একভাবে স্থির হয়ে সারারাত ধরে সবাইকে দিকের দিশা দেখাতে দেখাতেই জীবন কেটে গেলো! যাকগে, আর বেশিক্ষণ নয়, কিছু পরেই ভোর হবে, তখন ঘরে ঢুকে দোরে খিল দিয়ে ঘুমোবো।”
এদিকে নেপালচন্দ্র আর বগলাচরণ বেশ অনেকটা পথ হেঁটে আসার পরে নির্জন এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ায়, কে যেন অনুসরণ করছে! বগলাচরণ পিছু ফেরে, গলা খাঁকারি দেন, “কে! কে পিছু নেয়!”
“নির্ঘাত ভুত! রাম, রাম! বগলা, তোকে তখনই ফিরে যেতে বলেছিলাম। এখন কি হবে!” নেপালচন্দ্র বগলাচরণের হাত শক্তভাবে চেপে ধরেন।
“ন্যাপলা, মেলা বাজে কথা না বলে দৌড় লাগা।”
বেশ খানিকটা দৌড়ে নিরিবিলি এক জায়গায় এসে নেপালচন্দ্র থেমে যান, “কুঁচকি কুঁচকে গেলো, জিভ বেড়িয়ে গিয়ে হাঁফ লাগছে। আর ছুটতে পারছি না।”
“রাজার নজরদারি করতে করতেই আমার প্রাণ যায়। কি কপাল করেই না জন্মেছিলাম! এরকম অলস, হ্যাংলা, ভীতু রাজার মন্ত্রী কে হতে চায়! নেহাৎ বন্ধু বলেই–!” বগলাচরণও হাঁফাতে হাঁফাতে বলেন, “জলও পান করতে পারলাম না, জিভ এখনো হুহু করে জ্বলছে।”
নেপালচন্দ্র রাস্তার ধারে এক ভাঙাচোরা একতলা বাড়ির রোয়াকে বসে কাঁধের ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে অন্য আর একখানা স্টিলের কৌটো থেকে বেশ কয়েকখানা জিভে গজা বের করেন।
“জিভের ওপর জিভেগজা রেখে দে, জ্বালা কমবে। আরও কিছু আছে তবে জল আনার কথা মনে হয়নি।”
বগলাচরণ জিভেগজা জিভে রেখে আধো অন্ধকারে আশেপাশে নজর দিয়ে আর কোনো ঘরবাড়ি দেখতে পান না। শুনশান পথের দুপাশে গাছপালা, ঝোঁপঝাড়। বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে, জোনাকিরা জ্বলছে নিভছে।
একতলা সে-ই বাড়িটা মন্ত্রী বেশ ভালো করে পরখ করে দেখে বলেন, “এর তো দরজা ভাঙা, জনমনিষ্যি থাকে বলে তো মনে হয়না। ভুতের বাড়ি নাকি!”
সে কথা শোনামাত্র নেপালচন্দ্রের জিভেগজা তখন জিভেই আটকে কন্ঠ শুকিয়ে যায়, তুতলে বলেন, “আ-বা-র ভু-ত! ও বগলা, বাড়ি যাবো! এভাবে বেঘোরে মরতে রাজি নই।”
বগলাচরণ ততক্ষণে ভেজানো দরজায় ঠেলা দিতেই খুলে গিয়েছে। বাড়ির ভেতরে বোটকা গন্ধ, চারদিকে অজস্র জোনাকির আলো আর ঝিঁঝি পোকার ঝিনঝিনানি।
নেপালচন্দ্র তখন বগলাচরণের ডান হাত শক্ত করে চেপে ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকেছেন, “ভূত হোক বা মানুষ, যে-ই থাকুক,তার গায়ে বড্ড দুর্গন্ধ, স্নান করেনা।”
বগলাচরণ বিরক্ত হয়ে বলেন, “ভূতেরা কি করে স্নান করবে?”
নেপালচন্দ্র কিছুটা সাহস ফিরে পেয়ে বলেন, “আর এই ঝিঁঝির একঘেয়ে বাজনায় ঘুমোয়ই বা কি করে!”
“যত্ত আজেবাজে কথা! ভূতের আবার ঘুম! তা-ও রাতে! ওরা তো মানুষের ভয়ে দিনে বেরোয় না, রাতেই ঘোরাফেরা করে!”, মন্ত্রীও নাকে হাত চাপা দেন, “এর চেয়ে নরহরির সাথে আকাশকুসুম গ্রামে গেলেই ভালো হোতো।”
“সামনে ভাঁটার মতো জ্বলজ্বলে লাল রঙের আলো দুটো কিসের?” নেপালচন্দ্র আচমকা থমকে দাঁড়ান, খানিক আগের সাহস একেবারে উবে যায়, জোরে জোরে বলেন, ”রাম, রাম!” তারপর চোখ বন্ধ করে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকেন, দাঁতে দাঁত লেগে মূর্ছা যায় আর কি!
“রামনাম না করে আগে চটপট ঝুলি থেকে পেন্সিল টর্চ বের করুন।”
সেই মুহূর্তে ঝুপ করে কিছু পড়বার আওয়াজ হলো তার সাথে সেই লাল আলোর মালিককেও পরিষ্কার দেখা গেলো।
ডোরাকাটা এক বাঘ!
একসময় নেপালচন্দ্র আর বগলাচরণ দু’জনেই বনেজঙ্গলে ঘুরেছেন কিন্তু শিকার বা প্রাণী হত্যা করেন নি। আজ এইমুহূর্তে বাঘের মুখোমুখি হয়ে দুজনেই স্থবির হয়ে যান।
বাঘ আরও একটু সামনে এসে বসতেই তার হাড়পাঁজরা বের হওয়া জীর্ণশীর্ণ শরীর দেখে রাজা, মন্ত্রী দুজনেরই কষ্ট হয়।
বগলাচরণ ব্যথিত গলায় বলেন, ”ইস! এতো রোগা বাঘ আমি আগে কখনো দেখিনি।”
“আমিও দেখিনি! এ কি উপোষ করে নাকি!” ততক্ষণে নেপালচন্দ্র ঝোলা থেকে টর্চ বের করে সুইচ টিপেছেন। সঙ্গে সঙ্গে একজনের মোলায়েম কন্ঠস্বর ভেসে আসে,” আ মোলো যা! আলো জ্বালার কি দরকার! আলো একদম সয়না, নেভাও শিগগির।”
নেপালচন্দ্র টর্চ নিভিয়ে ঝোলার মধ্যে রেখে আন্দাজে কিছু বের করে প্রথমে মন্ত্রীর মুখে পরে নিজের মুখে পুরে দেন।
“বা:, ঝোলাতে মালপোয়াও আছে!” বগলাচরণ তারিয়ে তারিয়ে খান, “ক্ষীরের পুর ভরা মালপোয়ার স্বাদই আলাদা!”
মালপোয়া চিবিয়ে নেপালচন্দ্র সাহস ফিরে পেয়ে জোর গলায় সে-ই অদৃশ্য মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন,” নিজের সম্পর্কে ঠিকঠাক না বললে আবার আলো জ্বালাবো! এবারে নেভাতে বললেও নেভাবো না।”
“তোমরা খানিক আগে আকাশকুসুম গাঁয়ের নরহরির কথা বলছিলে না! আমি তার ঠাকুর্দা।” সে-ই মানুষের আবঝা অবয়ব বাঘের পেছনে ফুটে ওঠে।
রাজা আর মন্ত্রী দু’জনেই পরস্পরের গায়ে চিমটি কাটেন। বগলাচরণ অস্ফুটে বলেন, “তার মানে ইনি সে-ই থরহরি দাস।”
থরহরির কানে মন্ত্রীর কথা পৌঁছয় না, তার ধরা ধরা গলার স্বর শোনা যায়,” নাতিটা আমার বড় ন্যাওটা ছিল।”
“তোমার নাতিও তোমার খোঁজেই বারবার এ রাজ্যে আসে, তুমি জানো না?”
বগলাচরণ জিজ্ঞেস করেন।
“জানি। আজ যে তোমাদের সাথে দেখা হয়েছে, তা-ও জানি।” থরহরির বিষণ্ণ কন্ঠস্বর শোনা যায়।
এবারে নেপালচন্দ্রও অবাক হন, “তাহলে! তুমি তো আমাদের সাথে কথা বলছো, নাতির সাথে নয় কেন?”
“বাঘার জন্য।”
“বাঘা কি তোমার পোষা কুকুর? সে এখন কোথায়? আর এই বাঘ এতো রোগা কেন?” নেপালচন্দ্র এবার টর্চ জ্বেলে নিজের দাঁড়ানোর জায়গা ভালো করে দেখে নিয়ে সেখানেই বসে পড়েন, “আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।”
হাড়জিরজিরে বাঘের পিঠে বুড়োর আবঝা হাত এসে পড়ে, “এই হচ্ছে বাঘা।”
বগলাচরণও নেপালচন্দ্রের পাশে বসে পড়েন, “সব কিছু খুলে বলো। কিছুই বুঝতে পারছি না।”
থরহরি খুনখুনে মিহি গলায় নিজের কাহিনি বলতে শুরু করে, “আকাশকুসুম গ্রামের চারপাশে ছোট ছোট টিলা আর জঙ্গল, সেখানকার মানুষ জীবিকার জন্য চাষাবাদ করে, বন-জঙ্গলের কাঠ কাটে, ফল পাড়ে, মৌচাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করে, গরু ছাগল পোষে, বাইরের জগৎ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। গরীব হলেও শান্তিপ্রিয়। আমিও জঙ্গলে কাঠ কাটতে যেতাম, ঘরে বলদ, গরু, ছাগল ছিল। ছেলে ক্ষেতের কাজ করতো। সেবার গোয়ালের সাদা গরুটা বাছুরের জন্ম দেয়, তাকে পেটভরে ঘাসপাতা খাওয়াতে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আপনমনে কাঠকুটো কেটে ফলমূল, এটাসেটা জোগাড় করে বাড়ি ফেরার আগে সঙ্গে করে নিয়ে ফিরতাম। এরকম এক সময়ে একদিন সাদা গরু নিখোঁজ হয়ে যেতে তার খোঁজ করতে গিয়ে বাঘার দেখা পাই। বাঘা তখন সাদা গরুর দুধেল বাটে মুখ লাগিয়ে দুধ খাচ্ছিল। আমি তো অবাক! বাঘের বাচ্চা, তাও আবার একা! দেখে মনে হয়, এক বছরের বেশিই বয়েস, মাংস না খেয়ে দুধ খায় কেন! আমার সাহস বরাবরই বেশি, সঠিকভাবে অবস্থা বোঝার জন্য বেশ কদিন আড়ালে নজর রেখে দেখলাম, বাঘিনী দূর থেকে তার বাচ্চার দুধ খাওয়া দেখে ফিরে যায় অথচ গরুর ওপর আক্রমণ করেনা। বেশ কয়েকদিন পরে বাঘিনীর দেখা না পেয়ে একদিন গরু না নিয়েই জঙ্গলে গেলাম। আর তখনই দেখলাম বাঘা ঝোপের আড়ালে পায়চারি করে কুঁইকুঁই করে কাঁদছে, দূর থেকে নজর রাখতে গাছে চড়ে বসলাম, সকাল গড়িয়ে দুপুর গিয়ে বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যে হতে আমি গুটিগুটি পায়ে বাঘার কাছে যেতে সে আমার কাছে এসে হাত চাটতে লাগলো। তখনই বুঝতে পারলাম, বাঘিনী কেন তাকে ফেলে পালিয়েছে, কেনই বা সে দলছাড়া।”
নেপালচন্দ্র চুপ করে শুনছিলেন, থরহরি থামতেই বলে ওঠেন, “কেন, কেন?”
“বাঘার একটাও দাঁত বা নখ নেই।”
“মানে!”
থরহরির বিষণ্ণ কন্ঠস্বর হাওয়ায় ভেসে আসে, “মানুষের সংসারে কত অন্ধ, বোবাকালা, নানান শারীরিক, মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সন্তান জন্ম নেয়। জন্তুদেরও নেয় বোধহয়। মানুষের সংসারে তা-ও চলে যায় কিন্তু বাঘের দাঁত, নখ না থাকলে শিকার করবে কিকরে! খাবে কি! সারাজীবন কে দেখবে! বাঘাকে দেখে ভারি মায়া হলো, কিন্তু ওকে বাড়ি নিয়ে আসতেই বৌ, ছেলে, রে রে করে উঠলো। ছেলের বৌ ভয় পেয়ে একরত্তি নাতিকে নিয়ে দোর দিলো। আমি ভ্রুক্ষেপ না করে রান্নাঘরে গিয়ে ভাত আর দুধ নিয়ে ভালো করে মেখে বাঘার সামনে বাটিতে রাখতে সে হাপুসহুপুস করে সব খেয়ে নিলো। তারপর গ্রামের লোকেরাও জানতে পেরে ভিড় করে বাড়িতে এসে হামলে পড়লো। তাদের যতই বোঝাই, বাঘা কিছু করবে না, কেউ বিশ্বাস করেনা। বাঘাকে দেখলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে আসে, এরপর আমি সবসময় বাঘাকে সাথেই রাখতাম। কোনোরকমে মাস চারেক গিয়েছে, একদিন ঘুম থেকে উঠে বাঘাকে ঘরে না দেখে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে খুব চেঁচামেচি করছি তখনই ছেলে মুচকি হেসে বললো, “বাঘা নির্ঘাত জঙ্গলে চলে গিয়েছে।”
ছেলের মুখ চোখ আর কথা বলার ধরণে বুঝলাম, মিথ্যে বলছে, বাঘা আমায় ছেড়ে থাকেনা। আমি ছাড়া ওর দেখভাল করার কেউ নেই। কিছু না বলে শুকনো চিঁড়ে, মুড়কি গামছায় বেঁধে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। জঙ্গলে এক গর্তের মধ্যে থেকে বাঘাকে উদ্ধার করি। কাছে যেতেই ছুট্টে এসে আদরে গায়ের ওপর হামলে পড়ে। কলাপাতায় ভেজানো চিঁড়ে মুড়কি দিতে চেটেপুটে খেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে খেতে খেলা করে। আমি আর বাড়ি না ফিরে বাঘাকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হই।”
“শেষ টুকু?” বগলাচরণ এতোক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন।
“বনে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে এই রাজ্যে এসে খাওয়ার প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে অক্কা পাই। রাজার লোকেরা বাগানের পেছনদিকে আমায় ফেলে রাখতেই বাঘা সবার অগোচরে আমার দেহ মুখে করে টেনে এই পোড়োবাড়িতে নিয়ে আসে। তারপর থেকে দু’জনে এখানেই আছি। এখন সমস্যা হচ্ছে, আমার খিদে তেষ্টা না থাক, বাঘার তো আছে! তার সঠিক পরিমাণ খাবার জোগাড় করতে পারি না, বেচারা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এভাবে চললে ও মরে যাবে। ওর ব্যবস্থা না করে আমি মরেও স্বস্তি পাচ্ছিনা।”
নেপালচন্দ্র প্রশ্ন করেন, ”তা, এদ্দিন কিভাবে বাঘার খাবার জোগাড় হচ্ছে?”
থরহরি খিকখিক করে হেসে ওঠে, “ভূতেরা ইচ্ছেমতো অনেককিছুই করতে পারে, লম্বা হাতও বের করতে পারে। সেভাবেই বাড়িতে, দোকানে, হাটেবাজারে যখন যেখানে সুযোগ পাই চুরি করে যেটুকু পারি জোগাড় করি কিন্তু এই পলকা হাড়ে বেশি ওজন বইতে পারিনে। বাঘা এখন খিদের মুখে বিস্কুট, মুড়ি, পাউরুটি, মিষ্টি যা পায় সব খায় শুধু হাড় বা কাঁটা থাকলে খেতে পারেনা।”
“হুম!” নেপালচন্দ্র থলি থেকে মালপোয়া বের করে বাঘার মুখের সামনে রাখতেই বাঘা সেটা মুখে পুরে দেয়।
থরহরি বলে চলে,” তোমরা ছাড়া এই পোড়োবাড়িতে আজ পর্যন্ত কেউ আসেনি। যখন এসেই পড়েছো একটা উপকার করতে পারবে?”
“উপকার? কিরকম শুনি।” বগলাচরণ জানতে চান।
“এ রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যে, রঞ্জাবতীর খবর দিলে রাজার কাছে যা চাইবে তা-ই পাবে। তোমরা যা খুশি চাইতে পারো শুধু আমার বাঘার খাওয়া থাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে হবে।”
বগলাচরণ জিজ্ঞেস করে,” তুমি বুঝি সে-ই রাজকন্যার ঠিকানা জানো! কিন্তু রাজকন্যা তো স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছে, ফিরে আসতে রাজি না হলে!”
“সেটা অবশ্য হক কথা। তবে রঞ্জাবতীকে সবকিছু জানিয়ে রাজা-রানির সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে পারলে নিশ্চিত কিছু একটা সুরাহা হবে। তাছাড়া অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গিয়েছে, ঝিঙ্কুটচন্দ্রের নিশ্চয়ই অনুশোচনা হচ্ছে। যতই হোক, নিজের একমাত্র সন্তান। দেখা-সাক্ষাৎ হলে মান অভিমানের পালা শেষ হবে, তারপর নিজেরা নিজেদের ভালোমন্দ বুঝে নেবে। আমার চিন্তা বাঘাকে নিয়ে।”
বাঘা, ততক্ষণে মালপোয়া খেয়ে জিভ বের করে বসে এদের কথা শুনছে।
“খানিক পরেই ভোর হবে, তার আগেই আমাদের নিজেদের জায়গায় ফিরতে হবে। রাজকন্যা কতদূরে থাকে?” বগলাচরণ উঠে দাঁড়ান।
থরহরির ছায়াশরীর ভেসে পোড়োবাড়ির পেছনদিকে যায়, বাঘাও পিছু নেয়, বগলাচরণ নেপালচন্দ্রের হাত ধরে তোলেন।
“খুব সাবধানে আসতে হবে। ঝিঙ্কুটচন্দ্রের সেনারা কেন যে এ বাড়িতে আসে নি কে জানে! সামনে বুড়ো অশ্বত্থ গাছের পাশে এক গোপন সুড়ঙ্গ আছে,তার ভেতর দিয়ে প্রায় আধঘন্টা হাঁটলে একটা ছোট নদী পড়বে, পারে ডিঙি নৌকো বাঁধা আছে, সেটায় উঠে দড়ি খুললেই নৌকা তরতরিয়ে ভাসতে ভাসতে রঞ্জাবতীর আস্তানার কাছে নিয়ে যাবে।” অশ্বত্থের কান্ডে হাত ঠেকাতেই সুরঙ্গের প্রবেশ পথ দেখা যায়, বুড়োর আবঝা শরীর মাটি না ছুঁয়ে ভেসে ভেসে এগিয়ে চলে। নেপালচন্দ্র, বগলাচরণ আর বাঘা তাকে অনুসরণ করে।
সন্ধ্যাতারা তখন পূব আকাশে শুকতারা হয়ে আছে, সুজ্জিমামা উঠলে তবেই তার কাজ শেষ। সবাই মিলে ডিঙিনৌকোয় চড়ে নদী পেরোতেই পরিচ্ছন্ন এক গ্রাম দেখা যায়, বেশ কিছু কুঁড়েঘর, রাঙামাটির রাস্তার দুপাশে সবুজ গাছের সারি।
“প্রথম কুটীরেই রঞ্জাবতী থাকে, অন্য সব কুঁড়েঘরে রাজকন্যের ছাত্রছাত্রীরা।” থরহরির কথায় রাজা, মন্ত্রী অবাক হয়ে যান।
নেপালচন্দ্র প্রশ্ন করেন, “রঞ্জাবতীর ছাত্রছাত্রী!”
“এই গ্রামে কয়েকঘর আদিবাসী থাকে, তাদের ছেলেমেয়েরাই তার ছাত্রছাত্রী।
রঞ্জাবতীর স্বামী, ভিনদেশী সে-ই যুবক আদিবাসীদের সর্দার, সে অন্যান্য শিক্ষার সাথে সাথে সঙ্গীত শিক্ষা দেয় আর রঞ্জাবতী নৃত্য শেখায়। ঝিমঝিমপুরের সাথে এদের কোনো যোগাযোগ নেই।”
ঠিক সেইসময় সামনের কুটীরের দরজা খুলে এক অপূর্ব সুন্দরী নারী বেরিয়ে আসে, নেপালচন্দ্র নদীর পারে দাঁড়িয়ে থাকেন, বগলাচরণ এগিয়ে গিয়ে করজোড়ে জানান, “আপনি নিশ্চয়ই রঞ্জাবতী, একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি।”
রঞ্জাবতী টানাটানা দুচোখ মেলে মৃদু হেসে বলে, “এখানে আসার সুড়ঙ্গের খবর তো সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়!”
“ঠিকই বলেছেন। সংক্ষেপে বলছি।” বগলাচরণ নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রেখে সবকিছু খুলে বলতেই রঞ্জাবতীর সারা মুখে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে, ধীর স্বরে বলে,” বাঘাকে এখানে রেখে যেতে পারেন, তার দেখাশুনোর দায়িত্ব আমার। আপনার মুখে সব শুনে রাজ্যের সবার কথা ভেবে দুই মেয়েকে নিয়ে প্রাসাদে গিয়ে দেখা করতে পারি কিন্তু সেখানে আমি থাকবো না, ফিরে আসবো।”
বগলাচরণ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আশা করি সাক্ষাতের ফল মঙ্গল হবে।”
বগলাচরণ চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই রঞ্জাবতী বলেন, “খালি মুখে ফিরে যাবেন! অতিথি সেবা থেকে বঞ্চিত করবেন!”
“সামান্য কিছু ব্যবস্থা করেছি, আপনারা দয়া করে আসন গ্রহণ করুন।” পুরুষ কণ্ঠস্বরে রাজা এবং মন্ত্রী রঞ্জাবতীর স্বামীর দর্শন পান। শ্যামলকান্তি, স্নিগ্ধ, দীর্ঘ কায়, বুদ্ধিদীপ্ত এক যুবক, দুই ফুলের মতো মেয়ের হাত ধরে কুটীরের বাইরে বের হয়ে আসে, “রঞ্জাবতী, তুমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।”
নেপালচন্দ্র আর বগলাচরণ কুটীরের ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন তকতকে মাটির মেঝেয় পাতা আসনের সামনে ঝকঝকে বড় কাঁসার বাটিতে ভেজানো শালিধানের চিঁড়ে তার পাশে আরেক বাটিতে সর পড়া দুধ, রেকাবিতে রাখা দুটো মর্তমান কলা আর গুড়, কাঁসার গ্লাসে জল। দুজনে পরম তৃপ্তি করে খেয়ে ওঠেন। থরহরি কানের কাছে ফিসফিস করে, “বাঘা বহু দিন পরে পেট পুরে দুধ ভাত খেলো।”
রাজা আর মন্ত্রী কুটীরের খোলা দরজা দিয়ে অদূরে বটগাছের তলায় বাঘাকে খেতে দেখে, সামনে দুই মেয়ের হাত ধরে সুসজ্জিত রঞ্জাবতী।
রঞ্জাবতী কন্যাসহ ঝিমঝিমপুরে পৌঁছতেই রাজ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। মুখে মুখে তাদের আগমন বার্তা রাজপ্রাসাদের অন্ত:পুরে যেতেই রানিমা রাজপথে নেমে এসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, ঝিঙ্কুটচন্দ্র দুই নাতনিকে কোলে তুলে নেন।
রঞ্জাবতীর রাজপ্রাসাদে ফিরে আসার কারণ শুনে ঝিঙ্কুটচন্দ্র লজ্জিত হয়ে রাজকন্যার হাত ধরে অনুনয় করে, “আর ফিরে যাস না। এ রাজ্যে থেকে যা, আমি নিজে তোর স্বামীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো।”
“সেসব পরে ভাবা যাবে, এখন ইনাদের সাথে আলাপ করো।” রঞ্জাবতী নেপালচন্দ্র আর বগলাচরণের দিকে আঙুল দেখালে ঝিঙ্কুটচন্দ্র কৃতজ্ঞতা জানায়, “আপনারা কি উপহার চান?”
“সবার আনন্দতেই আমাদের আনন্দ।” নেপালচন্দ্র বলেন, “আনন্দপুর রাজ্যে আপনাদের আমন্ত্রণ জানালাম।”
“আপনারা?” রঞ্জাবতী প্রশ্ন করে।
“উনি আনন্দপুর রাজ্যের রাজা নেপালচন্দ্র আর আমি উনার মন্ত্রী, বগলাচরণ।” বগলাচরণ করজোড়ে নিজেদের পরিচয় জানাতেই ঝিঙ্কুটচন্দ্র তাদের সমাদরে আপ্যায়ন করে।
রাজা মন্ত্রীর কথায় থরহরির বাড়িতে খবর যায়, তার সদগতির ব্যবস্থা হয়।
এরপর সবার কাছে বিদায় নিয়ে রাজা আর মন্ত্রী আনন্দপুর রাজ্যের দিকে রওনা দেন। সুড়ঙ্গপথ ধরে দুজনে নিজ রাজ্যের ভেতরে প্রবেশ করতেই তুফান আর বাদামী কাছে এসে দাঁড়ায়।
বগলাচরণ বাদামীর পিঠে চড়ে বসেন কিন্তু নেপালচন্দ্র তখন কাঁধের ব্যাগ থেকে কৌটো খুলে অবশিষ্ট মিষ্টদ্রব্য খেতে আরম্ভ করেছেন। সেদিকে তাকিয়ে বগলাচরণ হোহো করে হেসে ওঠেন, ”পেটুক রাজা বুঝি একেই বলে।”
নেপালচন্দ্রও স্মিতহেসে মন্ত্রীর দিকে এগিয়ে যান, তার হাতে ব্যাগ ধরিয়ে তুফানের পিঠে উঠতে উঠতে বলেন, “দিনের আলোয় ব্যাগ নিয়ে যাওয়া রাজাকে শোভা পায়না। এবার যাত্রা শুরু করা যাক।”
“বুঝলাম, মহারাজ।”
পাশাপাশি রাজামন্ত্রী ঘোড়া ছুটিয়ে দেন।