গল্প - ৩ । চৈত্র ১৪৩১



খেলা খেলা 












গৌরী বর্মণ

আগরতলা, ত্রিপুরা



 

অনেক অনেক দূর থেকে শব্দ ভেসে আসছে। 
    -- ঠাম্মি, এই যে তোমার হাতে চকোলেটের র‍্যাপার। টুকরাগুলি নিয়ে তুমি ঘুমিয়ে গেছো। দাও, আমার হাতে দাও। 

শ্রুতি, নির্দ্বিধায় শ্রুতিদেবীও বলা যায়। মনে কত কিছু খেলা করে। মন বলছে, না না; অনুভবে ভাবছেন, বাতাসের ঢেউয়ের উপর শুয়ে আছেন। সবার কথা ভেসে ভেসে আসছে। খুব মনোযোগ দিয়ে ভেসে আসা ছবি ধরতে চাইছেন। 

একটু দূরে ছেলে নির্মল, বৌমা নিকিতা, নাতি নয়ন, ডাক্তার.... মনে হয় ডাক্তারই.... সাদা লম্বা কোটের মতো! ওভারকোট?  না, না! ওটা বোধহয় এপ্রোন পরে আছে.... আরো দুয়েকজন। কথা বলছে সবাই। 

-- একটা টাইমজোনের ফারাক, সাথে রয়েছে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবার চেস্টা। সব মিলিয়ে এই কীর্তন।  

-- ঠিক হয়ে যাবে। পছন্দের জুস আর সুপ খেতে চাইলে তাই দেবেন। 

সাদা এপ্রোন এবার ধীরে ধীরে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সবাই আবার বিছানার চারধারে। 

-- ঠাম্মি, র‍্যাপার মানে যা কাগজ নয় তা অন্য আলাদা রাখবে। কাগজ আলাদা জায়গায়। তোমাকে উঠতে হবে না। আমি আছি তো!! 

‘হ্যাঁ, ভাই তুমি আছো। আমি, ঠাম্মি নির্ভার’। কয়েকদিন এমনি ভেসে ভেসে, ঘুমিয়ে কাটলো নয়নের ঠাম্মির। 


কিছুদিন পর। 

নয়ন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছে। ব্যাগ  রাখে শেলফে। দৌড়ে সোজা শ্রুতিদেবীর পাশে এসে বসে পড়ে। 

-- তোমার শরীর আজ ভালো? 

-- হ্যাঁ। 

-- দেখাতে পারবে কাগজ কোথায় ফেলবে?  

শ্রুতিদেবী, নয়নের ঠাম্মির হাসি পায়। কিন্তু একদম পরীক্ষায় বসেছে ভাব ধরে রাখেন চোখেমুখে। অসহায় মুখে হালকা মেঘের আসা-যাওয়া। 

-- আরে ঠাম্মি, ভয়ের কিছু নেই। তোমার শরীর খারাপ ছিল ত, মনে না পড়লে আমি আবার বলে দিচ্ছি। 

-- বলেই দাও ভাই। আবার শুনি। ভুলভাল হবার চান্স কম থাকবে। 

নয়ন হাসে।  নাতিবাবুর উৎসাহ প্রশংসার দাবীদার। দেরি না করে বলা শুরু। 

-- এই যে দেখো বক্স.... ঢাকনা খুলবে। দেখো, এটাতে মাম্মা খাবারের ফেলে দেয়া জিনিস ফেলেছে। এই দেখো, এটাতে শুধুই কাগজ। এটাতে ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের টুকরো। আর এটাতে দেখো ভাংগা গ্লাস। তুমি এবার থেকে কাজ করার সময়ে এগুলি খেয়ালে রেখো। 

-- এই?  আর কিছু নয়? নয়নের নয়ন অবাক। ঠাম্মিকে দেখতে থাকে। 

-- কি হলো ভাই? বলো কিছু?  

একটু সময় চুপ থেকে নয়ন বলতে থাকে। 

-- এখানে সবাই খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। কিছু নিয়মও মেনে চলে। যেমন, ধরো ফুল, ফল সবই রাস্তার উপরেই আছে। সাধারণভাবে কেউই এগুলো ধরেও দেখে না। আপন মনে ওরা আছে ওদের মতো। 

-- এখানে ত পূজা দেবার চল নাই। নয়ন হেসে ফেলে। 

-- সবাই গীর্জায় যায়। ওখানে ফুল- ফলের কোনো ব্যবহার নাই। 

-- ফুল দরকার পড়ে তো কিনে দেয়। 

এবারে হাসির পালা ঠাম্মির। নয়ন আবার বলা শুরু করে। 

-- এখানে কেউই রাস্তা নোংরা করে না। নিজেরা বাড়ি ঘরের কাজ করে। রাস্তার কোণায় বাগানের ডালপালা ছেঁটে রেখে দেয়, পরে মিউনিসিপালিটির লোক এসে এসব উঠিয়ে নিয়ে যায়। তাছাড়া কেউই জোরে কথা বলে না। রোড ট্রাফিকের নিয়ম মেনে চলে। 

-- আমিও একটা গল্প জানি। 

-- কী গল্প? বল ঠাম্মি বল। 

-- ওই দিন তোমাদের সাথে শহরে গিয়েছিলাম। 

-- হ্যাঁ, তখন দেখলাম, ছোট ছেলে তার খাবারের প্যাকেট ডাস্টবিনে ফেলতে গেছে। চলে যাবার মুহূর্তে সে দেখে, প্যাকেট ডাস্টবিনে যায় নি। সে ফিরে আসে; ঢাকনায় চাপ দেয়, সাথে সাথে কাগজ ঢুকে যায়। তারপর? ছেলেটি নিশ্চিত হয়ে মায়ের সাথে চলতে শুরু করে। 

-- আমাদের স্কুলে এসব বলে তো। জিনিস জায়গায় রাখা, নিজের কাজ নিজেকে করতে বলে। খেলার জায়গা নোংরা না করা। তুমি যেয়ো একদিন, তোমার ভালো লাগবে। বাগানের কাজে আমরা ম্যামদের হেল্প করি। 

-- পরিবেশ পরিচয় দিয়ে স্কুলের পাঠ শুরু হয়। 

-- এ্যা? পরিবেশ পরিচয়? এ আবার কী ঠাম্মি?  

-- এ-ই যা যা বললে তুমি.... রাস্তায় নিয়ম মেনে চলা, বাগান পরিস্কার রাখা, নিজের কাজ নিজে করা... এগুলো বইয়ে না পড়ে.... হাতে কলমে করছো, আর শিখে গেলে তোমাকে কী কী করতে হবে। এ-র নাম পরিবেশ পরিচয় বা পরিচিতি। 

-- তুমি আমাকে কিছু শেখালে। আমিও তোমাকে কিছু জানালাম।  

ঠাম্মি খুব হাসলেন। 

-- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন.... দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে।  তুমি আমাকে তোমার নতুন দেশের কথা বললে, আমি তোমাকে কবিগুরুর কথা জানালাম। কেমন হলো?  

নয়নের দাদুভাই বাগানে হাঁটতে হাঁটতে সব শুনলেন। 

-- নয়ন, দাদুভাই। একটা কথা আমাকে বলো তো দেখি? 

-- কী কথা দাদুভাই?  

-- তোমাদের এই গ্রামে কয়টা ঘর আছে?  

-- হবে ত্রিশ পয়ত্রিশ ঘর। 

-- এই ত্রিশ পয়ত্রিশ ঘরে যা দেখা গেলো... আছে, তিনজন, বেশি হলে পাঁচজন। তুমি গুণ মানে ইন্টু করা শিখছো, বলো এবার লোক কত হবে?  

নয়ন চট করে বলতে পারছে না। দাদুভাই হেসে সময় দিলেন। নয়ন চোখ বন্ধ করে দুইহাতে গুণে বলে --- 

-- ওয়ান হানড্রেড এন্ড ফিফটি... এইরকম হবে। 

-- কারেক্ট।  ব্যস্। কথাটা হলো আমাদের ওই সব গ্রামে থাকে ওয়ান হান্ড্রেড ফিফটির আট দশগুণ মানুষ। তাহলে নজরদারি চালানো কাজটা খুবই কষ্টকর কাজ হয়ে পড়ে না কি?  তাই আমরা অপেক্ষা করবো অবশ্যই সেইদিনের যেদিন আমাদের দেশও ওই রকম সুন্দর হয়ে উঠবে। 

নয়ন হাসে। একবার দাদুকে দেখে আর একবার ঠাম্মিকে।  

সুনীল আকাশের দিকে তাকায়। এরোপ্লেনের উড়ে যাওয়া দেখে। পাখিদের কিচির-মিচিরে নতুন দিনের ছবি ভাসে। 

তা-র-প-র, ঝলমলে রোদ্দুরে লনে শুয়ে থাকা বলটায় জোরসে পা চালায়।