টিনটিন যেন বুড়ো হয়ে গেল! কপালের উপর সেই বাঁকানো চুল উধাও, মাথায় কয়েক গাছি কাঁচা-পাকা চুল। নোয়াপাতি ভুঁড়ি। হনহন করে হাঁটার সেই গতি নেই, একটু মন্থর যেন। ছোট্টখাট্টো মানুষটি পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছে। দেখে মনে হয় কুট্টুসটা যেন কোথাও একটু ঘুরতে গেছে, তাই সে একা-একা আপনমনে পথ চলছে।
প্যারাডাইস চৌমুহনী পেরিয়ে সিটি সেন্টারের দিকে ঘুরে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে একগাল হাসি। ভাবখানা এমন, গতকালই ওর সঙ্গে যেন দেখা হয়েছে আমার!
অথচ টিনটিন আগরতলায় ফিরল নয় নয় করে প্রায় ত্রিশ বছর পর। টিনটিনের চেহারা তেমন না-পাল্টালেও আমার চেহারা তো অনেকটাই পাল্টে গেছে। সে যখন ছিল আগরতলায়, আমরা তখন তার নীল বাইসাইকেল চেপে কোথায়-কোথায় চলে যেতাম। কখনও আস্তাবল ব্রিজ পেরিয়ে লিচুবাগান, কখনওবা চন্দ্রপুর পেরিয়ে রেশমবাগান অথবা জওহর ব্রিজ পেরিয়ে ভট্টপুকুর এলাকায়। আমার সেই ঝাঁকড়া চুল কবে ঝরে গিয়ে মাথা বিলকুল ফাঁকা। তখন আয়নার সামনে থেকে সরতে ইচ্ছে করত না, সুযোগ পেলেই শ্যাম্পু করা অবাধ্য চুল আঁচড়ানো। আর আজকাল পারতপক্ষে আয়নার সামনে দাঁড়াই না। কিন্তু টিনটিন এত বছর পরও চিনতে একটুও ভুল করেনি।
আমিও তার সঙ্গ নিলাম। পেটে খোঁচা দিয়ে জিঞ্জেস করলাম “ব্যাটা টিনটিন! কেমন আছিস?”
সেই বোকা-বোকা চাউনি তার। ফিসফিস করে বলল, “শান্তু, এই নামে আর ডাকিস না ভাই। মেয়েটা পেছনে আসছে। এই নাম জানতে পারলে আমার জিনা হারাম করে ছাড়বে মাইরি। মহা বিচ্ছু হয়েছে।”
টিনটিনের আসল নাম তরুণ। পেছনে তাকিয়ে দেখি জিনসের প্যান্ট আর কুর্তি পড়া মেয়েটির চেহারাতেও তার ছাপ স্পষ্ট। বাবার নিকনেম শুনলে মেয়েটি আহ্লাদিত হবে, নাকি রেগে যাবে বুঝতে পারলাম না।
“কবে এলি আগরতলা? জানাসনি তো?” আমার বুকের ভেতর চাপা অভিমান এখন।
“তুই নাকি আগরতলায় থাকিস না। এরকমই তো শুনলাম। মুম্বইতে সেটেলড?” তরুণ জিজ্ঞেস করল।
“নাহ্, পুনে। তোর সঙ্গে তো আর যোগাযোগই রইল না,” গলাটা এবার বুঁজে এল আমার।
“বাড়িতে আসিস। চলে যাব শিগগির।”
“শোন না, একদিন সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করব,” বলতে গিয়ে নিজেই থেমে গেলাম।
হাত নাড়তে-নাড়তে টিনটিন চলে যেতে গিয়েও ফিরে এসে বলল, “বাড়ি গিয়ে কিন্তু টিনটিন বলে ডাকিস না রে ভাই।”
তরুণের নাম আমি-ই টিনটিন রেখেছিলাম। আজকে আড্ডায় তাকে বলতে পারলে ভালই হত। কিন্তু তার ফোন নম্বরটাও নেওয়া হয়নি। মেলারমাঠ কালিবাড়ির সামনে মোবাইল রিচার্জ করিয়ে আবার ফিরে এলাম সিটি সেন্টারের সামনে। ঘড়িতে সন্ধ্যা ছয়টা। এখনও বন্ধুরা সবাই আসেনি। আমিও এবার অনেক বছর পর আড্ডায় এলাম। সবার সুবিধার জন্য এই সিটি সেন্টারের সামনের জায়গাটাই বাছা হয়েছে ।
সিটি সেন্টারের সামনে এখন তরুণ-তরুণীদের ভিড়। স্যারের বাড়ি থেকে ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে আসা কিশোর-কিশোরীরা দিব্যি হাতে হাত ধরে ঘুরছে। উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত এই প্রজন্ম। আমাদের সময় এমন স্বাধীনতা ছিল কই!
নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলাম আমি। পশ্চিমদিকের ফটকের সামনে অপেক্ষা করার কথা সবার।
বছর ত্রিশেক আগে আমাদের আড্ডা ছিল প্রাণবন্ত। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। আঠারো-উনিশ বছরের যুবকদের আড্ডার মেজাজটাই থাকে অন্যরকম। সেবারই শেষ আমরা একসঙ্গে নেমন্তন্ন খাই। টিনটিন সেই যে রেগে কাঁই হয়ে চলে এসেছিল, তারপর আড্ডায় এলেও নেমন্তন্নবাড়িতে সঙ্গ দেয়নি। আর যাই হোক না কেন, ক্ষিধেটা বেচারা একদম সহ্য করতে পারত না।
“শ্রাদ্ধ বাড়িতে খেতে-খেতে বাড়িতেও শেষপাতে চিড়ে দই চোখে ভাসে রে!” বিশুটার গলা একেবারে মাইকের মত। সেদিন সকাল থেকে তাকে খাই-খাই বাতিকে পেয়ে বসেছিল।
চৌমাথার ডানদিকে জগুর চায়ের দোকানটা এবার খুঁজে পাইনি। চায়ের দোকানের পাশেই ছিল আমাদের আড্ডার জায়গাটি। এর নাম হুতাশ চৌমুহনী রেখেছিল বিশু।
“এই নাম কেন রে?” বিশুকে জিঞ্জেস করতেই সে এমনভাবে তাকিয়েছিল যে আমি যেন আকাট মুখ্যু।
“হুতাশে যারা চলে, মানে উদভ্রান্তের মত যাদের চলন-বলন সেই সব ছেলেপিলেদের আড্ডা এখানে, তাই হুতাশ চৌমুহনী। শ্মশানযাত্রার নাম শুনে তোরা যে ভাবে লাফালাফি করিস তাতে এছাড়া আর কী বলা যায় তোদের!” বিশু কোদালের মত দাঁত বের করে বলেছিল।
আমাদের মধ্যে গৌতম অন্যরকম। তার নীতিবোধ প্রখর। তোম্বাপানা মুখ করে বলেছিল, মানুষের শেষযাত্রার সঙ্গী হওয়া পূণ্যির ব্যাপার। কত মানুষের শেষযাত্রায় সঙ্গী খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা না গেলে অন্তত পক্ষে গোটা পঞ্চাশেক লোকের শেষকৃত্য হতে লেজে-গোবরে হতে হত।
কথাটা একশ শতাংশ সত্য। রবিদাসপাড়াতে থাকত নান্টু রবিদাস। বাপ-দাদা জুতো সেলাইয়ের কাজ করত। সে রিক্সা চালাত। অল্প বয়সেই যক্ষ্মা রোগ হল। সারাক্ষণ কাশতে-কাশতে, হাঁফাতে-হাঁফাতে রিক্সা চালাত নান্টু। একদিন সারাদিন রিক্সা চালিয়ে এসে বাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে উঠোনেই ধপাস করে পরে গেল, মরেও গেল।
টাকা নেই, পয়সা নেই। শেষকৃত্যের খরচ কে জোগাবে? খবর পেয়ে আমরাই ছুটে গেলাম। এই হুতাশ চৌমুহনীর সদস্যরাই শেষযাত্রার সঙ্গী। শেষকৃত্যের খরচও জুগিয়েছিলাম আমরাই।
এমনি করেই চলতে লাগল। শেষমেষ এমন হল যে আমাদের চেহারা দেখলেই শ্রাদ্ধবাসরে মানুষ দিব্যি চিনতে পারছিলেন। মানুষের শেষযাত্রায় সঙ্গী হিসেবে আমাদের অতিরিক্ত আদর-আপ্যায়নও জুটতে লাগল। শ্রাদ্ধবাসরে ভাল-মন্দ থেতে-খেতে বাড়ি-ঘরের রান্না আর মুখে রুচত না আমাদের।
কিন্তু সব অচেনা মানুষের শ্মশানযাত্রী হওয়া তো আর যায় না। তবে শ্মশানযাত্রী না হলেও শ্রাদ্ধবাড়িতে যেতে তো আর বাঁধা নেই। এই আড্ডায় কু’বুদ্ধিতে সেরা টিটু। তার তালে পরে সাদা কাপড়ের প্যান্ডেল দেখলেই ঢুকে পড়ে সেকী পেট পুরে খাওয়া! বিয়েবাড়ির মত শ্রাদ্ধবাড়িতে অতটা ভয় নেই। শোকগ্রস্ত মানুষ, কে এল, কে খেল, ততটা খেয়াল করেন না। আত্মবিশ্বাস এমন বেড়ে গেল যে দিব্যি অচেনা বাড়িতেও আমরা দল বেঁধে ঢুকে পড়তাম। সেবার তরুণ ওরফে টিনটিনকে জোর করে নিয়ে গেলাম এমনই একটি বাড়িতে। কে মারা গেছেন জানি না আমরা। কার শ্রাদ্ধ তা অজানা হলেও আমরা দিব্যি ঢুকে পড়লাম ভট্টপুকুরে এই বাড়িতে।
সেদিন দুপুরে আড্ডা পিটছিলাম সবাই মিলে। আড্ডার মেজাজও জম্পেশ ছিল। রাজা তাড়াতাড়ি চলে আশায় ফুরফুরে মেজাজ।
এক-একটি আড্ডায় এমন একজন মানুষ থাকে যাকে আড্ডার প্রাণপুরুষ বলা যায়। আমাদের আড্ডাতেও ঠিক তেমনই ভূমিকা পালন করে থাকে রাজা। অবলীলায় বানিয়ে-বানিয়ে গল্প বলতে তার জুড়ি নেই। তার কথা-বার্তাকে গল্প না বলে গপ বলাই শ্রেয়।
এসেই সে বলল, “আজকে ক্ষিধে নেই রে। সকাল থেকে যা খাওয়া চলছে! বলিস না আর।”
ভরদুপুরে সবার পেটে ছুঁচো ডন-বৈঠক শুরু করেছে। আর এমন সময় তার খাবার নিয়ে গপ শুরু হল। রাগে আমি দাঁত কিড়মিড় করছি তখন।
টিটুটার সব কিছুতেই অতি-অতি। রাজাকে উস্কে দিয়ে বলল, “আজ কী তোর জন্মদিন?”
“আরে না জন্মদিন হবে কেন? জন্মদিন না-হলে কী ভাল-মন্দ খেতে নেই! আরে আজ আমাদের বাড়িতে ন’মাসিমা এসেছে।”
রাজার ন’মাসিমা। তার যে ‘ক’ থেকে শুরু করে ‘হ’ পর্যন্ত কত-কত মাসিমা, তার ইয়ত্তা নেই!
আমাদের হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাজা বলল, “আরে আমার মায়ের দাদু তো সিলেটের তাহিরপুরের জমিদার ছিলেন। উনার বড় ছেলের সেজ মেয়ে ন’মাসিমা। ছোট থেকেই ন’মাসিমা ভাগলপুরি গরুর দুধ খেতেন, গাধার দুধে স্নান করতেন। একেবারে ফর্সা ধবধবে। যেন রাজকন্যা। দাদুর বড় প্রিয় ছিলেন ন’মাসিমা। ন’মাসিমা ভাল রান্না করেন। খেতেও খুব ভালবাসেন। আজ সকালে মাসি ফুলকো লুচি খাঁটি ঘিয়ে ভাজলেন। মা নারিকেল দিয়ে বুটের ডাল করল। কিসমিস-টিসমিস দিয়ে জম্পেশ একেবারে। সঙ্গে বেগুন ভাজা। আহ্।”
আমরা যেন চোখের সামনে খাবারগুলো দেখছি। যেন চারদিকে লুচি, বেগুনভাজা, বুটের ডালের গন্ধ ম-ম করছে।
ভূতের রাজা যদি আমাদেরও বর দিতেন, আমরাও গুপী-বাঘার মত হাতে হাততালি দিয়ে এই মুহূর্তে স্বাদে-গন্ধে জিভে জল আনা খাবার এই আড্ডায় নিয়ে আসতাম।
বিশুটা ম্যান্দামারা চেহারা নিয়ে বসে আছে। আর আমাদের সবার মনটা কেবলই খাই-খাই, খাই-খাই করছে। সে-সময় ধীরেন্দ্র বলে উঠল, “খাবারের গন্ধ পাঁউ।”
ধীরেন্দ্র ব্যাটা আবার কুকুর প্রজাতির। মাইল খানেক দূর থেকে দিব্যি খাবারের গন্ধ পায় সে!
ধীরেন্দ্র খাবারের গন্ধের কথা বলতেই আমরা নড়ে-চড়ে বসেছিলাম। আশেপাশে কারওর বাড়িতে অনুষ্ঠান আছে বুঝি!
“কোথায়? খবর আছে কিছু?” ধীরেন্দ্রকে এমনভাবে বিশু জিঞ্জেস করল, যেন মনশ্চক্ষে ধীরেন্দ্র সব দেখতে পাচ্ছে। ধীরেন্দ্রর ঝুলিতে বুঝি যাবতীয় উত্তর লুকিয়ে আছে!
সতি-সত্যিই ধীরেন্দ্রর কাছে খবরাখবর থাকে। তার দাদার ডেকোরেটরের ব্যবসা তো। তাই বোধহয় বিয়ে-শ্রাদ্ধ-অন্নপ্রাশন, সবকিছুর খবর থাকে তার কাছে।
বিশু হ্যাংলার মত ধীরেন্দ্রর কাছে আবার জানতে চাইল, “ভাই, ধারে-কাছে কোথাও কী মোচ্ছব?”
ধীরেন্দ্র একটু ভাবল, তারপর বলল, “ভট্টপুকুরে শ্রাদ্ধবাড়ির জন্য দাদার কর্মচারীরা সাদা থানকাপড় নিয়ে গেছে গতকাল। কিন্তু বাড়িটা কোনটা সেটা তো জানি না।”
“বাড়ির মালিকের নাম জানিস?” বিশু জিঞ্জেস করল।
“না তো।” মুখটা ব্যজার করে উত্তর দিল ধীরেন্দ্র।
আমাদের মনে যেটুকু আশার সঞ্চার হয়েছিল, সেটা দপ করে নিভে গেল আবার।
আমাদের কপাল ভাল কী মন্দ জানি না, ঠিক সে-সময় ধীরেন্দ্রর দাদার ডায়মণ্ড ডেকোরেটার্সের বাঁধাধরা রিক্সাওয়ালা শম্ভুদা ডেকোরেটরের জিনিসপত্র নিয়ে বটতলার দিকেই যাচ্ছিল ।
ধীরেন্দ্র চেঁচিয়ে ডাকতেই থামল শম্ভুদা। তার কাছ থেকে শেষপর্যন্ত বাড়ির লোকেশন, নাম-ধাম জানা গেল।
আমরা হেঁটেই রওনা হলাম। ভট্টপুকুর বেশি দূরে নয়। তরুণ ওরফে টিনটিন যেতে চাইল না প্রথম। বলল, “ভাই খুব ক্ষিধে পেয়েছে আমার। সকালে খাওয়া জোটেনি। এখন বাড়ি গিয়েই খেতে বসব।”
ভাল-ভাল খাবারের লোভ দেখিয়ে টিনটিনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম আমরা।
বাড়িটা বেশি দূরে নয়। তাই হেঁটে পথ চলছিলাম আমরা। বিশু আর টিনটিনের সাইকেল আছে। তাতে করে সবাই যেতে পারব না। অথচ আজকাল বাবা-মা পয়সাওয়ালা না হলেও প্রত্যেকের বাইক-স্কুটি না থাকাটাই যেন আশ্চর্যের।
বেশি একটা কষ্ট হল না। সহজেই বাড়িটা খুঁজে পাওয়া গেল। শ্রাদ্ধবাড়িতে মেলা লোকজন। মাথার চুল কামিয়ে দু’ভাই গৌর-নিতাইয়ের মত চলাফেরা করছেন। আমাদের দেখতে পেয়ে হাত জোড় করে ভেতরে যেতে বললেন। ভেতরে ঢুকে দেখি সবেমাত্র এই ব্যাচের খাওয়া শুরু হয়েছে। বসবার সুবিধা নেই। একটুর জন্য ব্যাচটা মিস হল।
বাইরে বসে অপেক্ষা করছি সবাই। কখন খেতে বসব! এমন সময় লোকটা এসে কাছে বসল। গা-ঘেঁষা কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের চেনা-পরিচিতি লাগে না। বক-বক করতে পারলেই তারা বেজায় খুশ ।
ক্ষিধেয় পেট চুঁই-চুঁই করছে, এমন সময় ঘষা আলাপ ভাল লাগে! লোকটাকে কোনওদিন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সিরিঙে চেহারায় কেমন শেয়ালের মত ধূর্ত হাসি।
আলাপ-পরিচয় জমে উঠল। তিনি বললেন, “আপনাদের মতো শ্মশান-বন্ধু থাকতে চিন্তা নেই।”
বিশু সবসময়ই ভ্যাবলু মার্কা। ঠিক তার বিখ্যাত ট্রেডমার্ক কোদাল-দাঁত বের করে বিনয়ে গলে হেঁ-হেঁ করতে লাগল।
লোকটা যে ধুরন্ধর বুঝিনি। মুখের রেখাতে মনের ভাবের কোনও ছায়া পড়ল না! আশ্চর্য! দিব্যি বলতে লাগল, ‘জ্যেঠু যখন মারা গেলেন, তখন মাঝ-রাত। গভীররাতে লোকজন তেমন পাওয়া গেল না। সেবার আপনারা এলেন বলে রক্ষা। না-হলে জ্যেঠুকে শ্মশান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার লোক কোথায় সে-রাতে?’
কে জ্যেঠু বুঝতে পারলাম না। টিটু সিরিয়স চেহারা করে বলল, “জ্যেঠুর নাম কী!”
“অসিত সেন ।”
“ওই যে কামান চৌমুহনীতে ওষুধের দোকান?”
“হ্যাঁ। ঠিক।”
মনে পড়ল। অসিত সেন মারা গিয়েছিলেন রাত বারোটা নাগাদ। আজকাল রাত বারোটায় শহর জেগেই থাকে। সে-সময় রাত বারোটাকে নিশুতিরাত অনায়াসে বলা হত।
বডি নিয়ে শ্মশানে যেতে-যেতে রাত দেড়টা ।
সেই অসিতবাবুর ভাইপো এটি! আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শ্মশানবন্ধুকে পেট পুরে খাওয়ালেই পুণ্যি ।”
লোকটার পেরপেরি সহজে থামবে বলে মনে হয় না।
“মাসিমার চেহারা ছিল বটে! এই চেহারা দেখেই তো মেসোর বাবা এক মূহূর্তে তাকে ছেলের বউ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। এত বড় বাড়ির বউ ছিলেন। অথচ কোনও অহঙ্কার ছিল না।” লোকটা বলেই চলেছে।
বিশুটার বেশি কথা বলার অভ্যেস। কোন দরকার ছিল এত কথা বলার! অতিরিক্ত কথা বললে বেফাঁস মন্তব্য বেরিয়ে পড়বেই। এবং সেটাই হল। বিশু সোৎসাহে বলল, “সত্যিই। মারা যাবার পর মুখ থেকে যেন জ্যোতি বের হচ্ছিল। সেদিন শ্মশানে অনেকেই বলেছিলেন সে-কথা।”
শেয়ালমুখোর চোখ চকচক করে উঠল। আমাদের সবার দিকে সার্চলাইটের মত দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল, “মাসিমার তো কলকাতায় মৃত্যু হল। দাহ হল কেওড়াতলা শ্মশানে। আপনারা দলবেঁধে সেখানে ছিলেন বুঝি!”
কী উত্তর দেব?
ক্ষিধে-টিধে মাথায় উঠল। তরুণ “একটু আসছি,” বলে প্রথমেই উঠে পড়ল। যাবার আগে রোষানলে বিশুকে পুড়িয়ে ফেলার মত দৃষ্টি দেখে দুর্বাসা মুনির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল।
আমরাও উঠে পড়েছিলাম একে-একে ।
আজ অনেকদিন পর টিনটিনকে দেখে সেই পুরানো দিনগুলো ফিরে এল বুঝি।
একে একে সবাই জড়ো হচ্ছে। ধীরেন্দ্র, টিটু, রাজা, বিশু সবাই। সবাইকেই দিব্যি চিনতে পারছি। সবকিছুরই পরিবর্তন চারদিক জুড়ে। রাস্তা-ঘাট, মানুষ-জন, চলা-ফেরা, সংস্কৃতি— সবকিছুই বদলে গেছে। কিন্তু বন্ধুরা কেউই তেমন পাল্টায়নি। ধীরেন্দ্র আমাকে দেখতে পেয়ে বলল, “আজ একটা সারপ্রাইজ আছে। দেখবি।”
কী সারপ্রাইজ। ভাবছি।
“এত চিন্তার কিছু নেই। ওই দ্যাখ।” ধীরেন্দ্র হাত তুলে দেখাল।
আরে টিনটিন! সেও আসছে! কী কাণ্ড!
ধীরেন্দ্র বলল, “একটু আগে বটতলায় তার দেখা পেলুম।”
টিনটিন এসে সবাইকে দেখে সোৎসাহে বলল, “কী ব্যাপার! তোরা সবাই! একসঙ্গে! ভাবতেই পারছি না।”
ধীরেন্দ্র গম্ভীরভাবে বলল, “নেমন্তন্ন আছে!”
টিনটিন ভূত দেখার মত চমকে উঠল। পারলে সে দৌড়ে পালাতে চায়।
ধীরেন্দ্র তার হাত চেপে ধরে হাসতে-হাসতে বলল, “ভয় নেই রে। গজুর দোকানের সেই বিখ্যাত চপ খাওয়াব। কত বছর পর একসঙ্গে একটু চা-ফা খাব। অন্য কোথাও নয়, আমার বাড়িতেই। চল।”
টিনটিনের ভ্যাবাচেকা খাওয়া মুখে হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়ল।