শহর কলকাতা, মফস্সল
থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়া-গাঁতেও লোকমুখে, পাঠ্যপুস্তকের মারফত বা ফাংশনে আবৃত্তি শুনে ছেলেবুড়ো সবারই
ভবানীপ্রসাদের মজুমদার—এই নামটির সঙ্গে কমবেশি পরিচিতি। আমারও পরিচিতি ভবানীপ্রসাদ
সম্পর্কে এরকমই। এরপর শিশু শ্রেণি ছাড়িয়ে কৈশোরে পদার্পণের পর হাইস্কুলে এই
ভদ্রলোকের কবিতার সঙ্গে রীতিমতো পরিচয় ঘটে, বিশেষ করে
পাড়ায় বাচ্চাদের নিয়ে ফাংশানে তাঁর নামে পড়া আবৃত্তি করতে মাঝে-সাঝেই
শিশুদেরকে শোনা যায়। সেই থেকেই কিশোর মনে এই ব্যক্তি সম্পর্কে কল্পরাজ্যে এক
অন্যরকমের অনুভূতি, ধারণা বা আইডেন্টিটি গড়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে কবিতাকে ভালোবেসে ছন্দের হাতেখড়িও হয় এই মানুষটিকে ঘিরে।
আবৃত্তি শিক্ষণ কেন্দ্র—তা
সে শহরেই হোক বা গ্রামেই হোক, মাস্টারমশাই
বাচ্চাটিকে আধো আধো বুলিতে যে ছড়া-কবিতাটি প্রথম শেখান তা হল ভবানীপ্রসাদ
মজুমদারের ছড়া-কবিতা। বাড়িতে উপস্থিত সমবেত শ্রোতৃবৃন্দের কাছে বা পাড়ায়
পাড়ায়, ইস্কুলে ছোটো-বড়ো ফাংশনে ছোটো ছোটো বাচ্চার বলা
প্রথম ছড়া-কবিতাটি ভবানীপ্রসাদের। শিশু মানসের অন্তরে প্রবেশ করে আর ক’জনই পারেন এমন সুন্দরভাবে সাবলীল ভঙ্গিতে শিশুর কথাটি তুলে ধরতে? ভালো লাগে তখনই, শিশু তার মনের কথাটি যখন ভবানীদার
ভাষায় সুন্দরভাবে পরিবেশন করে। আর এখানেই ভবানীদার অনন্যতা। এই ভবানীদাই কিশোর
মনেও হানা দেন নানান জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন ও কৌতূহল নিয়ে নানান
ছদ্মবেশে। সামাজিক ঘটে যাওয়া বা ঘটে চলা নানান বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্নে ও
তৎসঙ্গে উত্তরের মারপ্যাঁচে হাস্যরসের বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গি নিয়েও হাজির হতে দেখা
যায় ভবানীদাকে।
একটা সময় দেখেছি ছোটো-বড়ো, ক্ষুদ্র-মাঝারি, উৎকৃষ্ট-বাজারি—নানান
সময়ে বের হওয়া নানান বিষয়ের পত্রিকা বিশেষ করে শারদ সংখ্যা খুললেই যে নামটি
প্রথম চোখে আসে তা হল ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের নাম। কী এমন জাদু যে তাঁকে বাদ দিয়ে
বা তাঁকে ছাড়া একটা সাহিত্য সংখ্যা হতে বা বের করতে সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলীকে পাঁচবার
ভাবতে হয়! সচল অবস্থায় সম্পাদকমণ্ডলীতে বা পরবর্তীতে উপদেষ্টামণ্ডলীতে তাঁকে
জানিয়ে বা না জানিয়ে বহু পত্রিকা সংস্থা তাঁর নাম ব্যবহার করে বা ব্যবহার করে
আসছে। কোনও সভাসমিতি বা পত্রিকার সম্পর্কিত আলোচনা সভায় বা বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর
নাম সর্বাগ্রে রাখতে কাদের না মন চায়? পক্ষাঘাতে
অস্ত্রোপচারের আগে পর্যন্ত বহু অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মাননীয় প্রধান অতিথি বা
সভাপতির আসন অলংকৃত করতে দেখা গেছে।
এরকমই একটা সাহিত্যসভা
থেকে সস্ত্রীক ফেরার পথে বাড়ি পৌঁছানোর দায়িত্ব পড়েছিল আমার উপর বা আমি নিজে
থেকেই এই দায়িত্বভার নিয়েছিলাম। লোভ ছিল এইরকম এক সাহিত্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গে
আরও কিছুটা সময় কাটানো বা তাঁর সঙ্গ লাভ করা। সভাটা ছিল নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য সংসদের
হাওড়া জেলা শাখার বার্ষিক ও নিজস্ব পত্রিকা ‘আলোর
ফুলকি’ ও তৎসহ কিছু পত্রিকার প্রকাশ অনুষ্ঠান। বহু
পুরস্কারের আয়োজন রাখা হয়েছিল অনুষ্ঠানটিতে। ছিলেন আনসার-উলদা ও রাসবিহারীদাও।
তাঁরাই আমাকে সস্ত্রীক ভবানীদাকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। যাওয়ার
পথে তাঁর উপদেশ ছিল আমার কাছে এক অমূল্য সম্পদ বা পাথেয়। যেটুকু সময় মিশেছিলাম
সেটুকুই আজ আমার কাছে স্মরণীয়। এই অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের আন্তরিকতা; আপন করে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আমাকে অভিভূত করেছিল। কী গল্প হয়নি—তাঁদের
পারিবারিক জীবন, আমার লেখালেখি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা, কৌতূহল, উৎসাহদান, কীভাবে চলতে
হবে তার উপদেশ—সবই ছিল সীমিত পরিসরের আলাপচারিতায়। সুযোগ্যা সহধর্মিণী পদ্মাবউদি ওই অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের হাতে চা বানিয়ে
দিয়েছিলেন। বাড়িতে রাখা মিষ্টিও খেতে দিলেন। বললেন অতীতের অনেক কথা, বর্তমানে মেয়েদের প্রবাস জীবন। পড়াশুনো, চাকরি-বাকরি,
নিজেদের স্কুলের শিক্ষক জীবন, ওভারল্যান্ড
পত্রিকার সাংবাদিকতা, সময়ের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি, ইত্যাদি। এই সময়েও কীভাবে অবাধ বিচরণ করেন ছড়া-কবিতার রাজ্যে, তার কথাও বলতে থাকলেন কবিজায়া পদ্মাবৌদি। তখনও পর্যন্ত প্রবাদপ্রতিম কবি
প্রায় ৮৬০০০-এর উপরে ছড়া-কবিতা লিখে ফেলেছেন, সে-কথাও
পদ্মাবতী নিজমুখে আমাকে শোনালেন। ছড়া-কবিতা পাগল মানুষটির জীবন বৃত্তান্ত,
অমানুষিক কঠোর পরিশ্রম, অগাধ নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ, আত্মনিবেদন
ধরা পড়ল আমার চোখে। একটা ছোট্ট ঘর, ঘরের প্রায় সমান অংশ
জুড়েই একটা বিরাট খাট। অনেকগুলো ইট বা কাঠের উঁচু করা ব্লক দিয়ে খাটটি বেশ উঁচু।
নীচে, উপরে, ডাইনে বামে অজস্র বইয়ের
ঠাসবুনন। কোনোটা বহুদিনের, কোনোটা-বা সদ্য প্রকাশিত। খাটের
উপরে অজস্র বই—তারই মধ্যে দীর্ঘদেহী এই মানুষটির বসবাস, শয়ন,
লেখনী, যাপন। ঘরে ঢুকতে সদর দরজাটিও নড়বড়ে,
পুরোনো। পুরোনো দিনের বহু ছাপ রয়েছে বাড়িতে। প্রবাদপ্রতিম,
সাহিত্য জগতের নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি ও মানুষটির ধর্মপত্নী
মাঝে-মাঝেই সময় সুযোগ পেলে নির্দ্বিধায় চলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলেন। ভালো
লাগল বৈকালিক সান্ধ্য পরিবেশ। দু-হাতে প্রণাম করে, মাথায়
আশীর্বাদ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নিজের গন্তব্যে।
কবিতা ও সাহিত্যকে
ভালোবেসে অনেক সময় অনেক সাহিত্যসভায় গিয়েছি, সমসাময়িক অনেক কবিকেই তাঁর নামে অপব্যাখ্যা, অপপ্রচার
করতে শুনেছি। হয়তো তাঁরা বন্ধু বা সমসাময়িক কবি লেখক গোষ্ঠী হওয়ায় তাঁদের এই
প্রবাদপ্রতিম কবিকে নিয়ে সমালোচনা সাজে, কিন্তু আমরা যারা
পরবর্তীতে সাহিত্য জগতে এসেছি তাদের কাছে তাঁর লেখনি, সাহিত্য
প্রতিভা পথের সন্ধান দেয়, আদর্শের পথে নিয়ে চলে।
আমার একবার সুযোগ হয়েছিল
সদ্য যৌবনে পদার্পিত সাহিত্য অনুরাগী কিছু ছেলেমেয়েদের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘নবাঙ্কুর’ শারদীয়া সাহিত্য পত্রিকায়
(সম্পাদক- তন্ময় মণ্ডল) শিশুসাহিত্যের দুই প্রবাদপ্রতিম অপরাজেয় শক্তিশালী
কবিপ্রতিভা ভবানীপ্রসাদ মজুমদার ও অপূর্ব দত্তের মাঝখানে ঢুকে পড়া। কবিতার
বিষয়বস্তু ছিল মা দুর্গার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বা কুকুরের বাচ্চা দেওয়া
ও মা দুর্গার ছেলেমেয়েদের মামাবাড়িতে এসে মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে সেই বাচ্চা
কুকুরগুলোর সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠার কাহিনি। ছড়া-কবিতার শিরোনাম ছিল ‘দুর্গাপিসি ও বাচ্চা কুকুর’। পুজোর প্রাক্কালে পত্রিকাটি প্রকাশ হওয়ায় মনে মনে দারুণ আনন্দ উপভোগ করতে
পেরেছিলাম পুজোতে। এ এক আমার জীবনে বাড়তি পাওনা।