ভ্রমনভিত্তিক ধারাবাহিক কাহিনি | চৈত্র ১৪৩১

 যেখানে আকাশ নামে











অসিত কর্মকার 

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ 



 

চার -

অনেক রাত হয়েছে। বাইরের পৃথিবী যেন জমাটবাঁধা এক অন্ধকারের পাথর। নিখিলেশস্যার আর বনি, দু’জনে মিলে পিকলুদের শোয়ার ব্যবস্থায় ব্যস্ত। মশারি টানিয়ে চারিদিক দিয়ে ভাল করে গুঁজে দিল বনি। জলের জাগ আর গ্লাশ টি-টেবিলে রাখল। পিকলুকে জিজ্ঞেস করল, ’খুব কি ঠান্ডা লাগছে তোমার?’


- ‘কই না তো। কাঁথাতেই হয়ে যাবে।

- ‘ঠান্ডাটা ভোরের দিকে বাড়ে, তখন লেপটা গায়ের ওপর টেনে নিও।বনি ফের বলল,’ অন্ধকারে  শুতে অভ্যস্ত নাকি ডিম-লাইটটা জ্বলবে?’

- ‘বাড়িতে আমি মায়ের সঙ্গে অন্ধকারেই শুই, কিন্তু এখানে…’

- ‘নতুন জায়গা, একটু অন্যরকম লাগতেই পারে। ডিম-লাইটটা জ্বলুক।নিখিলেশস্যার বললেন

- ‘সেই ভাল। আর ভয় পেলে আমার বিছানায় চলে আসতেই পার। শীতকাল, দু’জনে কোনও অসুবিধা হবে না।মিহিরকিরণস্যার বললেন

- ‘না, আমি এই বিছানায় একা আলাদাই শোব। ভয়ের আবার কী আছে!বীরত্ব দেখিয়ে জোরের সঙ্গে বলল পিকলু

ডিম-লাইটের আলোয় ঘরটা মুহূর্তের মধ্যে যেন অন্য এক জগৎ। কেমন  এক রহস্য-রোমাঞ্চের বলয় ঘিরে ধরেছে ঘরটাকে। জানলা-দরজা  সবই বন্ধ  যদিও কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে ঘটে চলা কত বিচিত্র শব্দ পিকলুকে সচকিত  করে তুলছে বার বার। যথেষ্ট যুক্তিনিষ্ঠ মন পিকলুর। সে ভাল করেই জানে, ওই শব্দগুলো সবই বাস্তব। আদি-ভৌতিক রহস্য-টহস্য বলে কিছু নেই। এ সময় রাতচরা পাখিরা শিকারে বেরোয়। বাতাসে তাদের ডানা জাপ্টানোর শব্দ। চোর এসেছে বা কিছু একটু বেগতিক দেখল বা সন্দেহে কুকুর ডেকে ওঠে। খাদ্যের সন্ধানে ইঁদুর-বিড়ালের ঘোরাঘুরির শব্দ। রাতচরা পশুও কিছু আছে যারা গভীর রাতে শিকারে বেরোয়। ভামবিড়াল,খটাশ ইত্যাদি। এসব তো পিকলু বইতে পড়েছে। তবে হ্যাঁ, শীতের রাতে পাতা থেকে পাতায় শিশির আর কুয়াশার ফোঁটা কেটে ঝরে পড়ার শব্দের কথা সে বইতে  পড়েছে কিনা মনে করতে পারছে না। অদ্ভুত মিষ্টি সে শব্দ। চুপিচুপি ঘটে চলে পৃথিবীতে। কান পেতে শুনতে হয়!

পিকলু ভীষণই ক্লান্ত। দু’চোখ জুরিয়ে আসছে ঘুমে। কাঁথাটা দিয়ে নিজেকে খুব করে জড়িয়ে নিল সে। এ নিছক এক কাঁথা জড়ানো নয়, এই আঠার ভাটির দেশ, এই বাদাবনের দেশ, এই গঙ্গারিডির দেশ, যেন বা গোটা সুন্দরবন  এই কাঁথা দিয়ে তাকে একান্ত আপন করে জড়িয়ে নিয়েছে। যে কাঁথায় এখানের মানুষ, পশুপাখি, জল-মাটি-প্রকৃতি জড়ামুড়ি করে আছে। দুখের কথা মনে পড়ছে পিকলুর। ওই অসহায় ছেলেটির এমন একটি কাঁথার খুব দরকার ছিল। অভাবী অন্ধ-মুক মা সন্তানের জন্য সেই উত্তাপটুকুর ব্যবস্থা করতে  পারেনি। ঘুমটা এসেও আসছে না পিকলুর। ঘুমের দেশকে ছুঁই ছুঁই করেও ছুঁতে পারছে না সে।এপাশ ওপাশ করছে। ওদিকে তার বাবার ঘোর ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে

একসময় পিকলুর যে ঘুম এল না তা নয় কিন্তু তাকে ঠিক ঘুম বলা যায় না। আধো ঘুম আধো জাগরণে এক স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেওয়া যেন। ওই কাঁথাকে ডিঙি নৌকো করে আকাশচারি হয়েছে সে। কোথায় চলেছে! কোন অজানার দেশে! একটু যেন বা ভয় ভয় করছে তার। কিন্তু ওই যাত্রি সে-ই তো! ভাল করে নিজেকেই নিজে দেখছে। বিভ্রম হয়, এ কি সে, নাকি ওই দুখে! আরে কে যেন ডাকছে না তাকে, ’পিকলু, পিকল!হ্যাঁ, তাকেই ফিরে আসার জন্য ডাকছে। তাহলে ও দুখে নয় সে-ই। সাড়া দিতে গিয়ে দুর্বোধ্য কিছু শব্দ তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তারপরই  এক কলকল   হাসির দমকে চেতনায় ফেরে সে। চোখ মেলে দেখে, তার সামনে দাঁড়িয়ে বনিদি। ঘরে নতুন দিনের আলোর লুটোপুটি খেলা। কত কত পাখির কলতান। বাতাসে হাল্কা উষ্ণতার মাখামাখি। পাশের বিছানায় তার বাবা নেই। যত রাতই জাগুন না কেন ভোরে ওঠা মাস্ট মিহিরকিরণস্যারের। এখানে এসেও তার ব্যতিক্রম হয়নি

- ‘ঘুম ভাঙ্গল তাহলে! খারাপ কিছু স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?’

- ‘ও কিছু না। অনেক বেলা হয়েছে তাই না?’

- ‘এই সাড়ে ছ’টার মতো হবে। তবে গ্রামদেশে এটা অনেকটাই বেলা।

মাত্র সাড়ে ছয়টা! অথচ কত কত আলো। দেখে পিকলুর মনে হয় অনেক বেলা হয়ে গেছে। খোলামেলা জায়গা বলেই সূর্যের এমন স্বাধীন গতিবিধি, বাতাসের অফুরাণ চলাফেরা। থেকে থেকে কাক আর মোরগ ডেকে উঠছে এদিক ওদিক থেকে। ওরাই তো পৃথিবীতে নতুন দিনের আগমনের ঘোষক। পিকলু এতক্ষণে খেয়াল করল তার গায়ে কাঁথার ওপর দিয়ে লেপটা কখন কে যেন টেনে দিয়েছে। কে?

- ‘তুমি যে পালাগান শুনে ফেরার সময় বলছিলে যেখানে আকাশ নামে দেখতে যাবে, যাবে তো? আজকে কুয়াশা বেশি পড়েনি। তাড়াতাড়ি রোদ তেতে যাবে। চলো ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ি।

হ্যাঁ, পিকলু তার বনিদিকে বলেছিল, ’যেখানে আকাশ নামে সেখানে তো কোনওদিন যাওয়া যায় না, তবুও চল না বনিদি যতদূর যাওয়া যায়।তারপর জানতে চেয়েছিল, ’স্যার আমাদের সঙ্গে একজনের পরিচয় করিয়ে দেবেন বলেছিলেন, সে কে গো? বিখ্যাত কেউ?’ বনি বলেছিল, ’তাহলে নিশ্চই দুর্লভ সর্দারের কথা বলেছে কাকু। আমাদের এদিকে বেড়াতে এসে অনেকেই তার সঙ্গে দেখা করতে যায়। পিকলু কৌতূহলি হয়ে জানতে চেয়েছিল, ’কে সে?’ বনি বলেছিল, ’গেলেই জানতে পারবে।‘ ‘তুমি না বড্ড রহস্য রেখে কথা বল বনিদি!পিকলু বলেছিল। হেসে উঠেছিল বনি

বনির সঙ্গে নীচে নেমে এল পিকলু। দেখল মস্তবড় এক গ্রামপ্রকৃতির বিস্তার। কাল আঁধারের ঘোমটায় যা ঢাকা পড়ে ছিল আজ সূর্যের আলোয় সে অবগুন্ঠন সরে গেছে। চারিদিকে আরও কত যে গাছপালা, চাষবাস, মেঠো পথঘাট, বাড়িঘর, পুকুরডোবা। হাঁসমুরগি, গবাদিপশুর বিচরণ। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যস্ততা। সামনের বড় রাস্তার গা ধরে লম্বা করে জলের রেখা, ঠিক যেন এক অপরিসর শান্ত নদী। দু’পার জুড়ে কতরকমের যে ছোট ছোট গাছপালা, লতাপাতার বিস্তার। তাতে প্রজাপতি-মথ-ছোটপাখিদের উড়াউড়ি। হাঁস চরছে কী সুন্দর!

- ’ওটা কি সত্যিই নদী?’ বনিকে জিজ্ঞেস করল পিকলু

- ‘না, নদী নয়, ওকে বলে নয়ানজুলি। বর্ষায় নয়ানজুলি জল ধারণ করে রাখে। চাষের সময় তা কাজে লাগে। তাহলে বুঝতেই পারছ গ্রামদেশে এর গুরুত্ব কত। মাছ, নানা রকমের শাকও পাই ওখান থেকে। এর উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে আরও কত রকমেরই না কীটপতঙ্গ, পোকামাঁকড়, শামুকগেঁড়ি, জলজ-উদ্ভিদ। ইকো-সিস্টেম এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ বলতে পার।

- ‘নয়ানজুলি! ভারি সুন্দর নাম তো! আমি তো ইকো-সিস্টেম পড়েছি।তার ছবিও এঁকেছি কত। আজ তা প্রত্যক্ষ করলাম। একবার খুব কাছে গিয়ে দেখব।‘ 

- ‘সে যেও, এখন তৈরি হয়ে নাও ঝটপট।

দু’জনে দাঁত ব্রাশ করছে। বনি বলল, ’চল পিকলু ব্রাশ করতে করতে তোমাকে আরেকটা জিনিস দেখাই।

- ‘কী জিনিস?’

- ‘চলই না!

বাড়ির পিছনে এল দু’জনে। ঘাটবাঁধানো পুকুরটা দেখে পিকলু তো অবাক। দু’সারি কী সুন্দর বসার জায়গা। সিঁড়িটা জলের গভীরে মুখ ডুবে আছে।কাঁচা নরম রোদ যেন সিঁড়িতে পিছলে গিয়ে জলে স্থির হয়ে শুয়ে আছে। চার পাড়ে নানারকম গাছপালা,শাক-লতাপাতা-গুল্ম। তাদের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে জলে। ছোট্ট একটা ঝোপ থেকে দুটো পাখি  বেরিয়েই সরু ঠ্যাং বাগিয়ে দৌড়ে অন্যদিকে চলে গেল। কালচে ধূসর গায়ের রঙ, চোখ দুটো ভারি সুন্দর। যেন তুলি দিয়ে  আঁকা। বনি বলল, ’ওটা ডাহুক পাখি, ওই ঝোপে বাসা বেঁধেছে  মনে হয়।কতরকমের মাছ হেলদোলহীন মন্থর গতিতে জলে ভেসে বেড়াচ্ছে।একরকম মাছ দেখে পিকলুর কৌতূহল হয়, ’ওগুলো কী মাছ বনিদি, ওই যে মাথার দু’দিকে ছোট বলের মতো?’

- ‘ওগুলো হল ডেমরে ভাঙ্গন’, শুধু ভাঙ্গন যেগুলো তাদের চোখ ওরকম বাইরের দিকে বার করা থাকে না।‘ ফের বলল, ’একটা মজার জিনিস দেখাই তোমাকে পিকলু।‘ বলেই বনি ছোট্ট একটা ঢিল তুলে যেই না পুকুরের মাঝখানে ছুড়েছে অমনি ভেসে থাকা মাছগুলো ঝুপুত শব্দ করে জলে আন্দোলন তুলে ডুব দিল। খানিক বাদেই আবার ভেসে উঠল। বনি বলল, ‘অক্সিজেন নিতে হবে না!

পুকুরের ওপারে কী একটা গাছ জলের দিকে ঝুঁকে সরু সরু কয়েকটা ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ডালে যে ছোট্ট পাখিটা বসে আছে তাকে পিকলু খুব চেনে। মাছরাঙা। কেমন একদৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে আছে। পিকলু ওর মতলব তো ভাল করেই জানে। সেই যে ছবিসহ ছড়াটা, ’মাছরাঙা ঝুপ করে পড়ে এসে জলে…!’ সেই পড়াটাই শুধু নয় মাছ ধরাটাও সে আজ নিজের চোখে দেখতে চায়। তাই সেও একাগ্র দৃষ্টিতে মাছটার দিকে তাকিয়ে আছে। ওই তো মুহূর্তের মধ্যে দু’ঠোঁটের ফাঁকে একটা ছোট মাছ পাকড়ে  ফের ডালে গিয়ে বসল! বাঁচার জন্য মাছটা ছটফট করছে। লেজের নড়াচড়া দেখতে পাচ্ছে পিকলু। কখন অস্ফুটে সে বলেই ফেলল, ’আহা রে বেচারা!

পুকুরের ওপারটা দিয়ে বিক্ষিপ্ত কয়েকটা বাড়িঘর। তারপর শুধু মাঠ আর মাঠ। শীতের ফসল ফলানোয় ব্যস্ত চাষীবাসী মানুষজন। অনেক অনেক ধূধূর পরে ছায়াছায়া দিকচক্রবাল। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনটা হুহু করে ওঠে পিকলুর।দূর ডাকছে তাকে। বলল, ’বনিদি, আমরা কি ওদিকে হেঁটে যাব?’

- ‘তোমার যেদিকে মন চায় চারিদিকে তাকিয়ে দেখ আকাশ কেমন নেমে আছে।‘

হ্যাঁ, আকাশ নেমে সব দিক দিয়েই ঘিরে রেখেছে পৃথিবীটাকে। কোনদিকে হেঁটে যাবে পিকলু! এমন সময় ‘হাম্বা’ ডাক শুনতে পেয়ে ডাকটার উৎস খোঁজে  পিকলু। কটা পেঁপে  আর ডালিম গাছের পাশ দিয়ে  লম্বা করে গোয়ালঘর। কী সুন্দর নাদুসনুদুস দেখতে একটা বাছুর ডাকছে। তার শেষ  প্রান্তে গোলাকৃতির উঁচু করে রাখা  ও দুটো কি?

বনি বলল, ’খড়ের গাদা। গরুর সারা বছরের খাবার। খড়ের আঁটি দিয়ে ঘরের চালও ছাওয়া হয়। এবার চল মুখটুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ি।

ওরা তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়তে যাচ্ছে। নিখিলেশস্যার আর  মিহিরকিরণস্যার বাজার করে ফিরলেন। নিখিলেশস্যার জিজ্ঞেস করলেন, ’কোথায় চললে বনি?’

- ‘যেখানে আকাশ নামে সেখানে কাকু!’  

নিখিলেশস্যার হেসে বললেন, ’সে ভাল, যাচ্ছ যাও কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরো।

- ‘ওখান থেকে কি তাড়াতাড়ি ফেরা যায় কাকু,যাওয়াও কি  একটুখানির পথ!রহস্যমাখা মুচকি হেসে বনি বলল

- ‘তবুও  যতদূর সম্ভব আমরা যাব  বনিদিচল।একরকম জেদধরা কন্ঠে বলল পিকলু। মোবাইলটা সঙ্গে নিয়েছে। মনের সুখে যত ইচ্ছে ছবি তুলবে। এই অচেনা অজানা জগৎটাকে যতটা সম্ভব ধরে রাখবে সে। 

- ‘নিশ্চই  যাবে। বেড়াতে এসে কিছু অ্যাডভেঞ্চার না হলে বেড়ানোর মজা হয় না।মিহিরকিরণস্যার বললেন

দু’জনে বেরিয়ে পড়ল ‘যেখানে আকাশ নামে’ সেই দেশের উদ্দেশ্যে। পিকলু জিজ্ঞেস করল কোন দিকে হাঁটা শুরু করবে বনিদি?

- ‘তুমি যেদিকে মন কর।

- ‘তাহলে সূর্য ওঠার দিকেই চল বনিদি। কাঁচা রোদের উষ্ণতা গায়ে মাখতে মাখতে হাঁটি।

বাড়ির  সীমানা পার হয়ে দু’জনে  মাঠে পা রাখল। সূর্যের দিকে হেঁটে চলেছে  ওরা। কিন্তু কতটুকু সময়ের জন্য আর ওরা শুধু দু’জন থাকতে পারল। এই বাড়ি ওই বাড়ি থেকে বড়-ছোট সকলের জিজ্ঞাসার পর জিজ্ঞাসা ভেসে আসছে। ‘বনি কোথায় চললি  এই  সাতসকালে?’ ’বনিদি  কোথায় যাচ্ছ গো?  তোমার  সঙ্গে ওই ছেলেটা কে গো?’ একই উত্তর কতবার যে  দিতে হচ্ছে বনিকে।তবে সে বলল না তাদের  আসল গন্তব্যের কথা। বলল, ’সম্পর্কে এ হল আমার এক ভাই। শহরে থাকে। গ্রামদেশে এই  প্রথম এসেছে  তাই  ভাইটাকে একটু ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।

কী দারুণ আন্তরিক কথা বলে বনিদি! মুগ্ধ  হয়ে  শুনছে পিকলু। ঠিকই করেছে বনিদি, আকাশ যেখানে নামে সেখানে যাওয়ার কথা বললে ওরা হয়ত মজা পেয়ে হাসাহাসি জুড়ে দিত। সে  কি ওদের  বোঝাতে পারত  তার মনের কথা। বনির বান্ধবি কয়েকজন, একে একে ছোটরা  প্রায় সবাইই ওদের সঙ্গ নিল। এমনকী পাড়ার দুটো কুকুরও কী মনে করে ওদের পিছু নিল। পিকলু ওদের আদর করতে গেলে বনি একরকম হায় হায় করে উঠল, ’অচেনা লোক কামড়ে দিতে পারে!পিকলু হেসে বলল, ’কিচ্ছু হবে না, দেখই না!ওরা দেখল, সত্যিই তাই আদর পেয়ে কুকুর দুটো এমন আচরণ করছে যেন পিকলু ওদের কতই না চেনা। বনি সবার সঙ্গে পিকলুর পরিচয় করিয়ে দিল। ওরা দল বেঁধে হাঁটছে। নিজেদের মধ্যে  কত  কথা, হাসাহাসি, ঠাট্টা-মস্করা করছে। একে অপরের কথা কাটছে, পিছনে লাগছে। পিকলুও একটু একটু করে ওদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কাছের হয়ে উঠছে। এ এক দারুণ আনন্দ, সঙ্গসুখ পিকলুর কাছে। শিশিরে পা ভিজে যাচ্ছে। তাতে জড়িয়ে যাচ্ছে ঘাস-কুটোকাটার টুকরো। কত  রকমের  যে ছোট্ট ছোট্ট গাছ। তাদের আবার ডালপালা। তাতে ফুলও ধরেছে নানা রঙের। ছোট্ট ছোট্ট। তাতে প্রজাপতি-মথও উড়ে উড়ে  এসে  বসছে। সে ভার নিতেও কত কষ্ট ওদের। প্রজাপতি  আর  মথের রঙের বাহারে মুগ্ধ পিকলু। কচি সূর্যের কাঁচা হলুদরঙ নরম আলোয় ওরা যেন স্নান সারছে। মেঠো  মাঁকড়সারা ঘাস - লতা - কাটাধানের গোড়ায় ছোট ছোট জাল বানিয়ে কাছেপিঠেই কোথায় শিকারের লোভে ঘাঁপটি মেরে আছে। জালগুলোয়  এখন শিশিরবিন্দু  মালা হয়ে ঝুলছে। সূর্যের আলোয় তা হীরকদ্যুতি ছড়াচ্ছে। কত রকমের যে গাছ -ঘাস-আগাছা-গুল্ম চিনছে পিকলু তার ইয়ত্তা নেই। নাম মনে রাখতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছে।আর এতরকমেরও পাখি আছে পৃথিবীতে! তাদের কী  যে বিচিত্র রপ-বাহার। বনি এক নিশ্বাসে কত যে পাখির নাম বলে গেল। আরেক জন বলে গেল যত নদীর নাম। সে শেষ করতেই আরেক জন বলল কত কত মাছের নাম। অন্য জন বলল  যত গাছের নাম। এই করে যেন প্রতিযোগিতাই লেগে  গেল। এসবই এই আঠার ভাটির দেশের। অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিকলু যে দু’চারটে নাম মনে রাখার  চেষ্টা করছে তা ওরা বুঝতে পারে না। মাঠে মাঠে শীতের শাকশব্জির কী দরুণ সম্ভার। ওরা আলপথ ধরে চলতে চলতে সামনে একটা ফাঁকা  মাঠ পেল। চাষহীন শূন্য মাঠ। শুধু  ধানের গোড়ায় ভরে আছে। মাঠটার কোল ঘেঁষে  দুটো ছাইবাবলা গাছ। নীচটা বেশ সুন্দর  ছায়াময়।বনি বলল, ’এস পিকলু, সবাই মিলে ওখানে  বসি। একটু শরীর জুরিয়ে নিই। এত হাঁটার অভ্যাস  নেই পিকলুর। এখনও অনেক পথ বাকি। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে যতদূর যাওয়া যায়!

ওরা গোল হয়ে গাছের ছায়ায় বসল। চারপাশে  হলুদরঙের গোল গোল ফুল ছড়িয়ে। একথা সেকথার মধ্যে বনি একসময়  আঙুল উঁচিয়ে অনতিদূরের দিকে নির্দেশ করে বলল, ’ওই যে গর্তগুলো দেখছ, সামনে গুড়োমাটি বার করা, ওগুলো হল ইঁদুরের গর্ত। ধান পাকলে  ইঁদুররা পাকা ধান গর্তে সঞ্চয় করে রাখে। সাপের খাদ্য ইঁদুর। ওই লোভে  ওরা  গর্তে ঢোকে। এদিকে অভাবী মানুষরা  খাদ্যের জন্য  মাঠে  নামে। ইঁদুরের দাঁতে  কাটা ধানের  ছড়া কুড়োয়। গর্তে হাত ঢুকিয়ে ইঁদুরের সঞ্চয় কেড়ে নিতে চায়। ভাগ্য  খারাপ হলে  সাপ বেরিয়ে এসে  ফণা  তোলে। ছোবল বসিয়ে প্রাণ পর্যন্ত নেয়।

আৎকে উঠল পিকলু। বাঁচার লড়াই  এত কঠিনও হয়! এও কি  ইকো-সিস্টেমের এক উদাহরণ হতে পারে?

ওরা ফের চলতে শুরু করে।  সূর্যটা  এখন আর অত নরমসরম নেই। চোখের সামনে কত পাখি আর পতঙ্গের আঁকিবুঁকি উড়াউড়ি। সামনে জলের  ধারা। তাতে  মিহি কুয়াশার চাদর।বনি বলল, ’এটা হল একটা খাল। চাষের জলের সুবিধার জন্য কাটা হয়েছে।

একে একে সোঁতা আর খাঁড়িও চিনল পিকলু। নদী মজে জলের ধারা ক্ষীণ হয়ে এলে সে নদী তার নামের গৌরব হারিয়ে সোঁতা নাম পায়। খাঁড়ি হল সরু শাখানদী। নদী বা সাগরের সংকীর্ণ ধারাকেও খাঁড়ি বলে। মোহনায় পড়েও নদী খাঁড়ির জন্ম দেয়। দুটো মাত্র  বাঁশ পাশাপাশি রেখে  বাঁধা। হাতল বলতে লিকলিকে একটা বাঁশ। এই নিয়েই তৈরি সাঁকো। ওরা কেমন ভয়-ডরহীনগটগট করে সুন্দর  পেরিয়ে গেল। পিকলু সাঁতার জানে না। বনি খুব সাবধানে পিকলুকে পার করিয়ে নিয়ে গেল। আবার হাঁটতে শুরু করে ওরা। মাঝেমধ্যে ছোট জনবসতি পড়ে, বিক্ষিপ্ত কিছু গাছপালার সমারোহ, তারপর আবার খোলা প্রান্তর। ধূধূর পর ধূধূ। কটা ধূধূ পেরোলে  মাটিতে  দাঁড়িয়ে  আকাশকে  ছোঁয়া যায় তা জানে না পিকলু। আর কিছু দূর হাঁটতে দু’দিকে প্রসারিত  আঁকাবাঁকা লম্বা মাটির  দেয়াল  যেন। পিকলু জিজ্ঞেস করল, ’ওটা কী বনিদি?’

- ‘ওটা নদীর ভেরি।যাকে  বলে বাঁধ। তা নইলে বন্যায় নদী উপচে জল চাষের জমি আর জনবসতি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দুর্ভোগের একশেষ হয়। নোনাজলে জমি চাষের অযোগ্য হয়ে যায়। ক’বছরের জন্য বৃষ্টির  জলে  ধুয়ে ধুয়ে  নোনা  দূর হয়ে  ফের চাষের যোগ্য হয়।

- ‘চল  বনিদি,নদী দেখি।

- ‘তুমি ভাবছ নদীটা খুব কাছে, তা কিন্তু নয়।

- ‘চলই না, কত আর দূর হবে।

ভেরি পর্যন্ত পৌঁছোতে পিকলু শ্রান্ত-ক্লান্ত। বসেই পড়ল সে। বাকিরাও নদীর দিকে মুখ করে পাশাপাশি বসে পড়ল। নদী এখন ভাটার পথে। ওরাও অল্পবিস্তর ক্লান্ত।একটি মেয়ে, চন্দনা বলল, ’এ হল গিয়ে গোমর নদীর বাঁক।

- ‘দেখতে শান্ত কিন্তু ভেতরে চোরাস্রোত খুব!একটি ছেলে বলল

- ‘গভীরও খুব!আরেকটি মেয়ে বলল

ভেরিবাঁধের গা ধরে ইট বিছানো। জায়গায় জায়গায় ইট  খসে  পড়ে গর্ত গর্ত।  বনি বলল, ’ঢেউয়ের তোড় মাটি বেশি সইতে পারে না। তাই  ইট বিছানো হয়। ঢেউ মারাত্মক হলে জায়গাবিশেষে ইট খসে পড়ে। জলের ধাক্কায় ধাক্কায় সেখানে গর্ত তৈরি হয়। ঘোগ চেনো তো? যাকে বাঘের শত্রু বলা হয়। ওই গর্তগুলোও তাই, ভেরিবাঁধের শত্রু। বাঁধের ভিতর খেয়ে খেয়ে ফোঁপরা করে দেয়। একসময় সেই পথে হুড়হুড় করে জল ঢুকে পড়ে চাষের ক্ষেত আর  জনবসতি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ক্ষতি হয় খুব। সুতরাং বুঝতেই পারছ, ওই গর্তগুলো আসলে আমাদের কত বড় শত্রু! সময়মত ব্যবস্থা না নিলেই বিপদ।

ওপারে গাছগাছালিভরা একটা দ্বীপের মত। সূর্যবেড়ে গাঁ। তার বুকের ওপর দিয়ে চোখ ফেলে আরও দূরে তাকাল পিকলু। আকাশ-মাটির মাখামাখি সখ্য সেখানে। পিকলুর মন চায়, ’আহাযদি যেতে পারতাম!

- ‘আরও কি এগোবে পিকলু? নদী পার হয়ে…।‘ বনি জিজ্ঞেস করল

- ‘না বনিদিআজ আর পারছি না।বড্ড কাহিল লাগছে।‘

- ‘কাল কি তাহলে এখান থেকেই শুরু করবে? তাহলে কিন্তু এখানেই একটা থাকার ব্যবস্থা করতে হয়!’ মুচকি হেসে বনি বলল

- ‘হ্যাঁ, তাই তো, ফিরে গেলে তো পুরোটাই পিছিয়ে গেলাম!একটু যেন বা বোকাই বনে গেল পিকলু। বলল, ’কিন্তু না ফিরেও যে উপায় নেই বনিদি!

ওদের সবার জলতেষ্টা পেয়েছে। খিদেও পেয়েছে বেশ। এবার ফিরতেই হচ্ছে। পিকলু বুঝতে পারছে, অ্যাডভেঞ্চারে অনেক কষ্ট সইতে হয়। ধৈর্য ধরতে হয়। কিন্তু এও বা কম কী হল। পায়ে হেঁটে  এত পথ সে কি কোনওদিন পাড়ি দিয়েছে, তার উপর এমন অচেনা অজানা পথেসে একদিন নিশ্চই এরচেয়ে ঢের ঢের লম্বা পথ পাড়ি দেবে। পৃথিবীরও সীমারেখা আছে। পরিধিতে বাঁধা সে। সেখানে পৌঁছোলে আকাশ আর মাটির মিলন সে নিশ্চই  দেখতে পাবে। কিন্তু আকাশ বলেই যে কিছু নেই। তাহলে ওখানের দৃশ্যটা কেমন হবে! সূর্যটা এখন মাঝ আকাশের কাছাকাছি, গনগন করে জ্বলছে। ওরা ফিরছে

পাড়ায় এসে যে যার মতো দলছুট হয়ে ঘরে ফিরে গেল।যাওয়ার আগে অবশ্য পিকলুকে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলল না কেউ। অনেকে বনিকে বলল ভাইটাকে তাদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। অর্থাৎ আমন্ত্রণ পেল পিকলু। তাতে পিকলু আপ্লুত। এমন করে একসঙ্গে এতজনে তাকে কিনা এত আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে! নিজেকে যেন  গুরুত্বপূর্ণ কেউ একজন মনে হচ্ছে তার। সেজন্য মনে মনে একটু লজ্জিতও সে। পিকলুও মিষ্টি হেসে আন্তরিকতার সঙ্গে ওদেরকে বিদায় জানাল। শরীর তার বড় ক্লান্ত। তেষ্টাও পেয়েছে ভীষণ। বনি লম্বা পা ফেলে তাড়াতাড়ি বড় একগ্লাস জল নিয়ে এল। এক নিশ্বাসে জলটা শেষ করে বনিকে ধন্যবাদ জানাল পিকলু। কুকুর দুটো এখনও পিকলুর পায়ে পায়ে ঘুরছে। বনি ওদের খাবার দিল, জল দিল

দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় শরীরটা একটু এলাতেই গভীর ঘুমে ডুবে গেল পিকলু

পাঁচ -

এখন বিকেল চারটে প্রায়। বনির ডাকে ঘুম ভাঙল পিকলুর। তৈরি হতে হবে যে। সবাই মিলে দুর্লভ সর্দারের বাড়ি যাবে। পিকলুর প্রবল আগ্রহ, কে এই দুর্লভ সর্দার! কিছুতেই খুলে  বলছেন না নিখিলেশস্যার। বনিদিও। পিকলু বলেছিল, একটু ঘুমিয়ে নিলেই শরীরটা তার ফের ঝরঝরে হয়ে যাবে। কিন্তু সেই ঘুম যে এত দীর্ঘ হবে তা ভাবতে পারেনি। তৈরি হয়েই পিকলুকে ডাকছে বনি, যাতে করে পিকলু  একটু  বেশি সময় ঘুমোতে পারে। তাড়াতাড়ি করে পিকলু তৈরি হয়ে নিল

খুব বেশি দূরে  নয়। কাছেই দুলকি গাঁ। ভ্যানরিক্সায় উঠে পড়ল পিকলুরা। আকাশে এখন মেঘপাহাড়ের  মন্থর চলাফেরা, তাতে পড়ন্তবেলার আলোর ধূসর আভা। সে আলোয়  গা ডুবিয়ে  পাখির দল ঘরে ফিরছে। যত গাছপালার ফাঁকফোঁকর পথে নরম আলোর টুকরোর  ছড়াছড়ি চারিদিকে। হাওয়ার গতির বিপরীতে ভ্যানরিক্সা চলছে তাই ঠান্ডাভাবটা একটু বেশি লাগছে। হাওয়ায় হাওয়ায় গাছেদের ছায়ার নাচানাচি। বড় রাস্তা ছেড়ে ভ্যানরিক্সা গলিপথ ধরল। মেঠো পথের বাঁকে এক বুড়ো বটগাছ। আকাশ বেড় দিয়ে  ডালপালার ঘের। গোরা ঘিরে  মাটির ভাঙ্গাচোরা চাতাল। তাতে ছড়িয়েছিটিয়ে কটা পোড়ামাটির ঘোড়া, বুনোফুল, সিঁদুরের ছাপছোপ। বনি বলল, ’ওগুলো হল আদিবাসীদের মানতমানা ঘোড়া।ওরা বলে ‘ছলন’।

কটা ছোট ছেলেমেয়ে গাছের নীচে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে। ভ্যানরিক্সা যেখানে এসে দাঁড়াল তার সামনে একটা খাঁড়ি মতো। ওপারে দুলকি গাঁ। সেখানে যাতায়াতের একটাই পথ। ওই নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোটা। নীচে দলদলে কাদা চিরে সরু জলের রেখা। সাঁকো পেরিয়ে  পিকলুরা  হাঁটতে থাকে। নিখিলেশস্যার এই গ্রামের  কথা বলতে  বলতে হাঁটছেন। দুই খাঁড়ির মাঝের এই ভূমিখন্ডে গ্রামের মানুষগুলোর ভারি কষ্টের জীবন। বন্যায় ভাসে। খড়ায় ধোঁকে। চাষাবাদ ফি-বছরের নোনাজলের ছোবলে কবেই বন্ধ হয়েছে। পাঁচগ্রামের লোকে বলে, ’এ গ্রাম না ভাগাড়!অথচ  এদেরই  পূর্বপুরুষের হাতে  গড়া এই বন কেটে বসতের দেশ। ওরাই আজ সমাজের প্রান্তিক মানুষ। বৃহত্তর সমাজজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। ঘুপসি-ঘুপসি ঘর, ডোবাপুকুর, হাঁস-মুরগি-শূকর আর নিদারুণ  দারিদ্র নিয়ে একেকটা পরিবার। এমন সব পরিবারগোষ্ঠি এই বাদার দেশে প্রচুর ছড়িয়েছিটিয়ে আছে। প্রকৃতির দীর্ঘ কালের সাধনার ফসল এই সুন্দরবন। কিন্তু সময়ের দাবি মেনে ইতিহাস আবর্তিত হয়। তখন ইংরাজ আমল। বন কেটে কৃষিজমি আর মনুষ্যবসতি গড়ে তোলার ঘোষণা হল। যত বেনিয়া, জমিদার, মুৎসুদ্দি আর ভূঁইফোঁড় বড়লোকেরা জমি বন্দোবস্তের ইজারা নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদের নিয়োগ করা চকদার - লাটদার - গাঁতিদাররা জঙ্গল হাসিলের লোক জোগাড়ের জন্য আড়কাঠিয়া নিয়োগ করল। ছোটনাগপুর, ছত্তিশগড়, বিলাসপুর, সুন্দরগড়, হাজারিবাগ, সিংভূম, রাঁচি, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আদিবাসী কৌম মানুষগুলোকে সুখে বাঁচার নানা টোপ দিয়ে ভারতবর্ষের এই প্রান্তভূমিতে আনা হল বন কেটে বসত গড়ার কাজে। সাঁওতাল, ওঁরাও, লোধা, মুন্ডা, কুর্মি, গোন্ড,ভূমিজ, খেড়িয়া ইত্যাদি আরও অনেক সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর বুকে  নানা বিদ্রোহ আর আন্দোলনের আগুনের শিখা ধিকিধিকি জ্বলে। তারই পরশটুকু সম্বল করে ওরা ভাগ্যান্বেষে ছিন্নমূল হয়। দাও-কুড়ুল-হাঁসুয়া-খন্তা ওদের কাজের সরঞ্জাম সেইসঙ্গে ওগুলো ওদের অস্ত্রও। অদম্য মনের জোর আর সাহস। মাথার ওপর ছাউনি নেই, পর্যাপ্ত খাদ্য নেই, পানীয় জলের অভাব। আছে শুধু অশ্রু-ঘাম-রক্ত ঝরা শ্রম দান আর যেকোনও সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। বাঘ-কুমির - সাপ, রোগজারি - অপুষ্টি - অনাহারের সঙ্গে লড়াই করে ওরা জঙ্গল হাসিল করে। জল প্রতিহত  করার জন্য ভেরি বাঁধে। হাতের জাদুতেই যেন  বন্ধা জমি চাষযোগ্য হয়। শর্তসাপেক্ষে ওরাও কিছু জমি পায়। বৃষ্টিনির্ভর চাষবাস। খরা-বন্যায় চাষ মার খায়। ক্ষুধায় এক থালা ভাতের বিনিময়েও সাধের জমি হাতছাড়া হয়। টিপছাপ নিয়ে বাবুরা জমি কাড়ে। দাদনি প্রথার যাঁতাকলেও পেষাই হয় মানুষগুলো। একে একে  সব হারিয়ে প্রান্তিক মানুষে চিহ্নিত হয়। বাঁচার  জন্য বাধ্য হয় বনে যেতে। বনের কাঠ -মধু - গোলপাতা - মাছ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘ-কুমিরের খাদ্য হয়। তবুও বনই ওদের মা।বনবিবি মা ওদের আরাধ্য দেবী।   

দুর্লভ সর্দার এমনই এক প্রান্তিক মানুষ। পূর্বপুরুষের পদবী ছিল মুন্ডা। তার ঠাকুরদার বাপ কাঠুরে দলের মাথা নির্বাচিত হলে সর্দার পদবী জোটে। ওই তার খড়ের দো-চালা মাটির ছোট্ট একটা ঘর। সামনে একফালি ধবধবে উঠোন। তাতে মাদুর পেতে শুয়ে আছে দুর্লভ সর্দার। পশ্চিমের ঢালে  চলে যাওয়া সূর্য আলো ফেলেছে তার গায়ে। রোদ পোহাচ্ছে বৃদ্ধ মানুষটি। বহুবার বনে গেছে। বাঘের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছে। সে সব রোমহর্ষক কাহিনি। বনের নাড়ি-নক্ষত্র তার জানা। সে  সব কাহিনি শুনতে আসে কত মানুষ। বয়সের গাছ-পাথর নেই তার। বিরল মানুষ। চলে গেলে এসব কাহিনি শোনানোর আর কেউ থাকবে না বাদার দেশে। খালি গা, পরনে খাটো ধুতি। চওড়া কাঁধ, চৌকো মুখাবয়বে গালের হনুজাগা শক্ত চোয়াল। একসময়ের তাগড়াই শরীরের জায়গায় জায়গায় ক্ষতচিহ্নের ঝিলিক এখনও ফুটে আছে। বয়সের কথায় খানিক চুপ থেকে কী যেন এক হিসেব কষে। বাদার দেশের যত ঝড়-বন্যার কথা বলে। গাঁয়ে ওলাউঠোয় মড়ক লাগার কথা বলে। সেই যে বাজ পড়ে তালগাছটা ঝলসে গেল সে কথাও বলে। বলে গাঁয়ের নদীতে ভুল করে ইলিশ মাছ ঢুকে পড়ার কথাও। একসময় খেই হারিয়ে ফেলে বলে, ’তমে এবারি বয়স-টর  হিসাব কষি লও মাষ্টর।

আর কত অবাক হবে পিকলু। দুর্লভ সর্দার মানুষটা একাই যে এক বিস্ময়। কত নতুন নতুন  শব্দই না শুনছে সে। এ দেশে কত না সম্প্রদায়ের মানুষ আছে। আচ্ছা, আদিবাসী কাদের বলে? সাঁওতাল, ওঁরাও, লোধা, মুন্ডা, ভূমিজ ইত্যাদি এরা কারা? কৌম বলতেই বা কী বোঝায়? সেই কোথায় কোথায় এদের বাসভূমি ছিল। কেমন সে সব বাসভূমি? ছিন্নমূল মানুষগুলোর সঙ্গে আজও কি ওদের যোগাযোগ আছে, নাকি ছিন্ন হওয়ার বহু যুগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে বেঁচে আছে ওরা। মুৎসুদ্দি, চকদার, লাটদার, গাঁতিদার, বেনিয়া ইত্যাদি এরাই বা কারা? কারা আড়কাঠিয়া? জানতে হবে পিকলুকে। ‘যেখানে আকাশ নামে’-র দেশে  যাওয়ার পথে ওদের ওই বাসভূমি পড়লে পিকলু কতই না খুশি হবে। সেখানকার মানুষের বার্তা বয়ে আনবে সে এদের জন্য। এদের কথাও বলবে সে ওদের। কিন্তু সে যে বড় কষ্টের কথা!

বয়সের ভারে ন্যুব্জ, স্মৃতিভ্রংশপ্রায় মানুষটা বনের কথা, বাঘের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে  ফেরার কত কথা ছেঁড়া ছেঁড়া মনে করতে পারে। মাঝেমধ্যেই কথার খেই ধরিয়ে দিতে হয়। তাতে কিছু কাহিনি উদ্ধার হয়। এ-ই বা কম কি?

গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে সবার। পিকলুর তো কখনও কখনও অবিশ্বাস্য লাগছে। অথচ মানুষটা কখনও বাঘ শিকার করেনি। বাঘের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে যতটুকু প্রতি-আক্রমন করতে হয় ততটুকুই করেছে। মানুষটার কথায় বাঘ মারতে তো সে বনে যায়নি কখনও, গেছে পেট বাঁচাতে। বাঘও চেয়েছে তার পেট বাঁচাতে কিন্তু তা সে হতে দেয়নি। পৃথিবীতে বাঁচতে কে না চায়? তা সে পৃথিবীটা তার কাছে যতই কষ্ট-যন্ত্রণার হোক। তাছাড়া বাঘ যে বনমাতা বনবিবির বাহন। বাবা দক্ষিণারায়ের বাহন। তার প্রাণ নিলে যে মহা পাপ হবে। এমনই গভীর বিশ্বাস মানুষটার। বনের আরও কত কাহিনি, এই ভাটিদেশের কত কথা আর তাদের সুখ-দুঃখের বারোমাস্যা শোনায় সে। বলতে বলতে কন্ঠস্বর ধরে আসে। আঁশ পড়া দু’চোখের দৃষ্টি বড় উদাস দেখায়। পূর্বপুরুষের মুখের বুলি হারিয়ে গেছে ওদের কিন্তু ছিন্নমূল হওয়ার কষ্ট-যন্ত্রণার গান ওরা আজও বংশ পরম্পরায় বুকে বয়ে নিয়ে চলেছে।মানুষটা অস্ফুট কন্ঠে গেয়ে ওঠে,

মইলিলিন গে

কাঁহা মইলিন বাজে করতাল

কাঁহা মইলিন বাজে 

নাগরালি সান সুঁদার

কাঁহা মইলিন…

যে ভরি জানলি

হেরি গুনা গাওলি

মইলিলিন গে…

এ গানের কী যে অর্থ, কী যে মানে তা আর ওরা ভাল করে বলতে পারে না, শুধু বেদনার আর্তিটুকু মনে গাঁথা হয়ে আছে

সূর্যটা অনেকটাই পশ্চিমে ঢলেছে। আলোর রঙ বাসি হলুদের মতো। একটু পর থেকে ছায়া নামতে শুরু করবে। পিকলুরা ফিরে আসছে। চলতে চলতে কী মনে করে পিকলু একবার পিছন ফিরে তাকাল। দেখল দুর্লভ সর্দার একরকম উপুড় হয়ে শুয়ে পিঠে রোদ লাগাচ্ছে। কিন্তু পিকলু এ কী দেখছে, মানুষটা যে নিজেই বাঘ হয়ে গেছে!

- ‘কী দেখছ পিকলু?’ বনি জিজ্ঞেস করল

- ‘ওই দেখ বনিদি।

বনিও দেখল। মানুষটার পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঘের নখের লম্বা লম্বা ক্ষত চিহ্ন। ক্ষতস্থানের বহিঃত্বকের কোষ ঠিকমত না জন্মাতে কালো চামড়ায় সাদাটে ডোরা ডোরা দাগ। তাতে আলো পড়ে যেন বা বাঘেরই পিঠ! 

সন্ধার আড্ডায় বসে কত না জিজ্ঞাসার উত্তর পেল পিকলু। নতুন শোনা সব শব্দের অর্থ জানল। ভাটির দেশের আরও কত না কাহিনি জানল। জানল এখানকার জনজীবনের ইতিহাস, ওদের উৎসব- পালাপার্বণ-লোকসংস্কৃতির কথা। রাত বাড়ছে। রাতের খাওয়া-দাওয়ার সময় হল। নিখিলেশস্যার বললেন, ’আরও অনেক অনেক কথা জানার আছে। ধীরে ধীরে সবই জানবে পিকলু।

খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় এসে মাকে ফোন করল পিকলু। সেইসঙ্গে দাদু-দিদানের সঙ্গেও কথা বলল। আজ সারাদিনের যত কিছু দেখা আর অভিজ্ঞতার কথা মন উজাড় করে ঢেলে দিল সে। মেতে উঠল পাঠানো যত ছবির বর্ণনায়

ঘুমিয়ে পড়ার আগে নকশিকাঁথাটাকে পরম মমতায় নিজের গায়ে জড়িয়ে নিল পিকলু। আজ সে স্বপ্নে কী দেখবে,  কোন দেশে পাড়ি দেবে জানে না

ছয় -

   আজ পঁচিশে ডিসেম্বর। বড়দিন। চারিদিকে তার উৎযাপন। উৎসবের মেজাজ। সারাদিন সবাই মিলে খুব মজা করল পিকলুরা। ভোরে উঠে স্থানীয় গীর্জায় গিয়ে প্রভুর জন্ম উৎসব পালন, গানপ্রার্থনায় সামিল হল। যেন অন্য ধর্মের নয় নিজেদের ধর্ম-উৎসবে মেতেছে পিকলু। বনির সুবাদে আরও কতজনের সঙ্গে পরিচয় হল তার। তারা সবাই নতুন পোশাক পরেছে। সবাই মিলে হৈচৈ করে অনেক রাত পর্যন্ত মেলায় ঘুরল, কতরকমের অচেনা খাবার খেল। স্থানীয় শিল্পী এবং কারিগরদের হাতের তৈরি জিনিস কিনল। নিখিলেশস্যার আর বনির কাছ থেকে উপহারও পেল কিছু। মিহিরকিরণস্যারও বনিকে নানা উপহার দিলেন।বাচ্চাদের হাতে হাতে বেলুন, বাঁশি, খেলনা পিস্তল আর বুড়ির চুল মেঠাই। কত রকমের যে খেলনা, খাবার আর ব্যবহারিক জিনিসপত্রের দোকান। ছোটদের হাতে হাতে খেলনা পিস্তল। ছোড়ার ফটাস ফটাস শব্দ। ম্যাজিক-শো আর নাগরদোলার ওদিকটায় ভিড় খুব বেশি।বেশি রাতে দেখা হল বাজি পোড়ানোর উৎসব। সে যে কত রকমের বাজি আর তাদের কারিকুরি!

পা দুটো টনটন করছে পিকলুর। শরীর ক্লান্ত। আর যেন পারছে না সে। মেলা ছেড়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা। কিন্তু পিকলুর মন পড়ে রইল মেলাতেই, নতুন নতুন সব বন্ধুদের মধ্যে। আর দেরি না করে খাওয়াদাওয়া সেরেই বিছানায় এল। খুব ভোরে উঠতে হবে। বাড়ি পৌঁছে তৈরি হয়েই সোজা স্কুল। মন খারাপের মধ্যেও পিকলুর আনন্দ যে তার বনিদি তাদের সঙ্গে যাবে।পিকলুদের বাড়ি। অনেক জোরজার করে রাজি করিয়েছে পিকলু। সঙ্গে বইপত্র নেবে কিছু যাতে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ফাঁকি না পড়ে। ফার্স্ট জানুয়ারির আনন্দ শহরে উপভোগ করবে সবাই মিলে। পিকলু সারাদিনের সব মজা আর আনন্দের কথা বাড়িতে জানালেও তার  বনিদি যে সঙ্গে যাচ্ছে সে খবরটা গোপন রেখেছে। সবাইকে সারপ্রাইজ দেবে

সাত -

ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙ্গল সবার। পিকলুকে আজও ডেকে তুলতে হল। পিকলু দেখল আজও কে যেন তার গায়ের কাঁথার ওপর লেপ চাপিয়ে দিয়েছে। কে যে চাপিয়ে দেয় তা অজানাই থেকে  গেল পিকলুর কাছে। কেন যেন জানতেও চাইছে না পিকলু। ওই যে তার বাবা বলেছেন না, বেড়াতে এসে কিছু রহস্য উপভোগ করা ভাল! নীচে নামার দরজা তো খোলাই থাকে। কে উপরে উঠে এসে তার গায়ে লেপ দিয়ে দেয়? নতুন দিদান না দাদু? নাকি বনিদি? হয়ত নিখিলেশস্যার নিজেই। কিংবা তার বাবা মিহিরকিরণ!

পুবাকাশে ভোরের সূর্যের চোখ ফুটছে সবে। তার রক্তিম আভার ছটা মাটির পৃথিবীতে একটু একটু করে হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। সেইসঙ্গে কুয়াশার আড়ালে উত্তুরে হাওয়ার কামড়। এই সবে কাক আর মোরগ ডেকে উঠল। তারপরই শুরু হল আরও কত না পাখির কলতান। পিকলুরা সবাই রওনা হওয়ার জন্য একদম তৈরি। পিকলুর ভীষণ মন খারাপ লাগছে। যেন দু’দিনের জন্য নয় অনেক অনেক বছর ধরে সে এখানে আছে। এ মাটিতে তার মনের  শিকড় চাড়িয়ে গেছে। আজ তা ছিন্ন হতে চলেছে। এই বাড়ি, বাড়ির সবাই, এই গ্রাম, মাঠ-ঘাট-নদী-গাছপালা, পশুপাখি, নতুন বন্ধুরা, বনবিবি-দুখে, অসীম সাহসী দুর্লভ সর্দার, এই বাদার দেশের কত কাহিনি-ইতিহাস ইত্যাদি সব ফেলে সে চলে যাচ্ছে।ভারাক্রান্ত মন তার। যেন বা সে আরেক দুখে। যে আকাশ নামার দেশে পাড়ি দিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু একদিন সে ওখানে যাবেই। নতুনদিদাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতে তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল

- ‘আবার এসো দাদুভাই।

- ‘আসব।পিকলু অস্ফুটে বলল

- ‘এটা তোমার জন্য, বড়দিনে দাদু-দিদার তরফ থেকে সামান্য উপহার।নতুন দিদা একটা প্যাকেট পিকলুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন

- ‘ওরে ব্বাবা, এ যে দেখছি মস্ত বড় এক উপহার! কী আছে গো দিদান এতে?’ পিকলু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল

- ‘খুলেই দেখ না!নতুন দাদু বললেন

বনি পিকলুকে প্যাকেটটা খুলতে সাহায্য করছে। নতুন দিনের কাঁচা আলোয় ফুটে উঠল অন্য এক নকশিকাঁথা। কতরকমেরই না সবুজ গছপালায় ভরা তার জমিন আর তাতে উড়াউড়ি করছে হরেকরকম পাখি। যেন এই প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে ওরাও নতুন দিনকে উৎযাপনে মেতেছে। দেখে পিকলু হতভম্ব একরকম

- ‘পছন্দ হয়েছে?’ বনি জিজ্ঞেস করল

- ‘খুব!

- ‘আমার দিদিমার হাতে তৈরি।যখন গায়ে দেবে তখন অন্তত আমাদের কথা মনে পড়বে!বলতে বলতে গলা ধরে আসে বনির

পিকলুদের ভ্যানরিক্সা চলেছে গোসবাগঞ্জের পথে। নতুন দিনে গ্রাম জাগছে। এ জাগা যেন অপার্থিব এক সুন্দর সুরে বাঁধা

গোসবাগঞ্জ। ভ্যানরিক্সা থেকে নেমেই পিকলু বলল, ’একটু দাঁড়ান, আমি একটু ওই সাহেবের বাংলোয় যাব স্যার।‘ বলেই সে ওদিকে পা বাড়ায়। 

বনি বলল, ’সামনে থেকে ভাল করে দেখতে চাইছ তো? চল আমিও যাচ্ছি তোমার সঙ্গে।

ওরা দু’জনে হ্যামিল্টন সাহেবের বাংলোটার দিকে হেঁটে চলেছে। মিহিরকিরণস্যার  বুঝলেন, নিছক একটি বাংলো দেখার জন্য পিকলু ওখানে যাচ্ছে না। ওটা যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত একটি বিশেষ আবাস। একটু সান্নিধ্য মনে না ধারন করে নিয়ে গেলে নিজেকেই ঠকানো হবে। ফের ভাবলেন,  ভুল তো তিনিও করতে চলেছিলেন। এমন মহার্ঘ সুযোগ কেউ কি হারায়!  নিখিলেশস্যারের উদ্দেশ্যে বললেন, ’চলুন, আমরাই বা বাদ যাই কেন।

নিখিলেশস্যার বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। চলুন যাই

বাংলোর কাছে এসে ওঁরা দেখছেন, বাংলোয় ওঠা-নামার যে ছোট্ট সিঁড়িটায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর চরণ রেখেছিলেন সেই সিঁড়িটাতে মাথা রেখে প্রণাম করছে পিকলু আর বনি

মিহিরকিরণস্যার বললেন, ’চলুন, আমরাও আগে প্রণামটা সেরে নিই। এই সাতসকালে ভেতরে ঢোকার উপায় নেই যখন বাইরেটাই ভাল করে ঘুরে দেখি তারপর।

বাংলোটা দেখে সবাই আপ্লুত। জীবনে এ এক পরম পাওয়া। 

খেয়াঘাটে এসে দাঁড়াল সবাই। মিহিকুয়াশায় জড়িয়ে কাঁচা রোদ।তার আভায় ভাসছে নদী,  নৌকো। ওদিকে তাকিয়ে নদীর ওপার দেখতে পাচ্ছে না পিকলু। ওপারটা যেন জল আর আকাশের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে বহু বহু দূরে কোথায় হারিয়ে গেছে। তারও ওপারে কোথায় যে আকাশ নেমেছে! দেখতে পাচ্ছে না পিকলু। তবে যেখানেই নামুক পিকলু সেখানে একদিন যাবেই যাবে। নতুন দিদানের দেওয়া উপহার নকশিকাঁথার পাখি হয়ে!

বনি পিকলুর হাতে মৃদু টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করলওই দূরের দিকে তাকিয়ে কী খুঁজছ পিকলু

কিছু না বনিদি। অস্ফুটে বলে পিকলু। 

কিছু না বললেই হল! মাটির বুকে আকাশ নামা খুঁজছ, তাই না? মৃদু হেসে বনি ফের বলল, আকাশ আর মাটির এই খেলা পৃথিবী থেকে কোনও দিন হারিয়ে যাওয়ার নয় পিকলু। ভাল করে আলো ফুটতে দাও, তোমার মাটির বুকে আকাশ নামা ঠিক দেখতে পাবে! ওখানে যাবেও তো ঠিক একদিন, তাই না! 

যাবই তো! জোরের সঙ্গে বলে পিকলু। 

খেয়া নৌকো পারে এসে ভিড়ল। ওপারের যাত্রি এপারে নামছে। এপারের যাত্রি চলেছে ওপারে। কোলাহলমুখর হয়ে উঠছে পৃথিবী। রোদ বাড়ছে। তার ছোঁয়ায় মুখ লুকোচ্ছে কুয়াশা। চারিদিকে জেগে উঠছে আকাশনামা মাটির দেশ। আর ততই নকশিকাঁথার পাখিরা ভর করছে পিকলুর উপর। সে একটু একটু করে হাল্কা হয়ে উঠছে, পাখির মতো। এই উড়াল দিল বলে...! পাড়ি দিল যেখানে আকাশ নামে...!