সনটা আশি-একাশি। ঠিকানা
খুঁজে খুঁজে প্রিয় লেখকদের চিঠি পাঠাচ্ছি। একের পর এক। ‘ঝিনুক’ এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে
পশ্চিমবঙ্গে। ডাকে চিঠি আসছে প্রতিদিন। পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড
ও খামে। একটা খাম বেশ মোটাসোটা, নানান রঙের ঠিকানা লেখা।
আগ্রহ নিয়ে খাম খুলতেই বিভিন্ন সাইজের রোল করা কাগজে হাফ ডজন মজার ছড়া। সঙ্গে
একটা চিঠি, নীচে লেখা ‘ভবানীভাই’,
পাশে হাওড়ার বাড়ির ঠিকানা। ভবানীভাই মানে ভবানীপ্রসাদ মজুমদার।
চিঠি এবং লেখা, নানা রঙের স্পেস দেওয়া, শিশুদের একটা সরল মনের ছবি, যেন আঁকা আছে তাতে।
জমজমাট মজার সব ছড়া, সহজ সরল শব্দে আঁকা, রয়েছে ছন্দের দ্যোদুল দুল। এভাবেই প্রথম যোগাযোগ, এভাবেই
প্রথম পরিচয়, এভাবেই ক্রমাগত ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়া।
অফিসের কাজে তখন প্রায়ই
কলকাতা যেতে হত। এক মাস ডেপুটেশনেও ছিলাম কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের উপর ইউনাইটেড
ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার অফিসে। তখনই জানতে পারি বুধ এবং বিশেষ করে শুক্রবারই লেখকদের
জোরদার আড্ডা হয় ‘সন্দেশ’-এর
স্টল নিউস্ক্রিপ্টের এ-পাশে ও-পাশে। এখানেই প্রথম পরিচয় ভবানীপ্রসাদ মজুমদার,
শিশিরকুমার মজুমদার, রাহুল মজুমদার, সুখেন্দু মজুমদার, রূপক চট্টরাজ এবং অনেক তরুণ ও
খ্যাতিমান লেখকদের সঙ্গে।
আমাকে সমস্ত লেখকদের সঙ্গে
পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ভবনীপ্রসাদ মজুমদার, রূপক চট্টরাজ এবং সুখেন্দু মজুমদার। সে-সময় ভবানীপ্রসাদ মজুমদার ছিলেন
তরুণদের মধ্যমণি। ছোটো-বড়ো অনেক কাগজের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলেন তিনি। ছোটো ছোটো কিছু
সংকলন, তাতেও তিনি ছিলেন উপদেষ্টা। আমার কাছ থেকে নিয়মিত
লেখা চেয়ে নিয়েছেন এবং যত্ন করে ছেপে পাঠিয়েছেন ডাকে। লক্ষ করে দেখেছি, তরুণ লেখকদের অনেকেই চা স্টলে বসে এক কোনায় দাঁড়িয়ে লেখা ঠিকঠাক করে
নিচ্ছেন। আমার সামনে একজন তরুণ লেখক লেখা দেখালে তিনি বললেন, “দেখত শব্দটার পরিবর্তে এই শব্দটা বসালে পড়তে কেমন লাগে? কিংবা এই লাইন থেকে একটা শব্দ সরিয়ে নিলে?”
এইভাবেই তিনি অনেক তরুণ
লেখকের লেখা ঠিক করে ছাপিয়েছেন বিভিন্ন কাগজে। লেখা পড়ে একবারও বলতে শুনিনি
লেখাটা ভালো হয়নি। মানে তরুণ লেখককে কক্ষনো হতাশ করেননি। ওভারল্যান্ড-এর
সবুজবুড়োর ছড়া গড়ার আসরে বহু লেখক লিখেছেন। তথ্য, বিজ্ঞান এবং স্বাস্থ্যের কাগজেও তিনি নিজে যেমন ভিন্ন ছন্দনামে লিখেছেন তেমনি তরুণদের লেখা আমন্ত্রণ করে নিয়ে ছেপেছেন। এই সবই ছিল শিশুসাহিত্যের প্রতি
অগাধ ভালোবাসার উজ্জ্বল নিদর্শন।
আপাতত গম্ভীর মনে হলেও
তাঁর ছড়া পড়ে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত। তিনি শিশুতোষ নির্মল হাসির ছড়া
লিখতেই ভালোবাসতেন এবং এ-ব্যাপারে তিনি ছিলেন সম্রাট সুকুমার রায়ের যোগ্য
উত্তরসূরি। কথা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, “দেখো,
একদম ছোটোদের জন্য খুব কম লেখা হচ্ছে। সবাই তো দেখছি কিশোরদের জন্যই
বেশি লিখে, তাই আমি একদম ছোটোদের কথা ভেবেই ছড়া লিখি।”
ভবানীপ্রসাদ যদিও এই কথা
বলেন, তবুও তিনি সমাজের বিভিন্ন দিক, বিশেষ
করে অন্ধকার দিকগুলোকে আলোকিত করার লক্ষ্যে বহু ছড়া লিখেছেন। চাবুকের মতো ওইসব
লেখাও আজ মুখে মুখে ফেরে। সেই সময় তাঁর লেখার প্রভাব পড়েছিল বহু তরুণ লেখকদের
মধ্যে। কী ছন্দে, কী ভাবনায়, ছড়ার
উপর, সে ছড়ার নামকরণেও।
ত্রিপুরার বহু কাগজে
লিখেছেন ভবানীপ্রসাদ। আমি নিজে লেখা এনে বিভিন্ন কাগজে দিয়েছি। লেখা চেয়ে কেউ
তাঁর কাছ থেকে লেখা পাননি, আমার অন্তত জানা নেই।
দুইবার আগরতলায় এসেছিলেন।
একবার ‘কাব্যলোক’-এর অনুষ্ঠানে, অন্যবার সরকারি অনুষ্ঠানে। কাব্যলোকের উত্তম চক্রবর্তী তাঁদের অনুষ্ঠানে
ভবানীপ্রসাদ মজুমদারকে আনতে চাইলে আমি ফোনে যোগাযোগ করে দিই। সালটা সম্ভবত ২০০৪।
দু-তিনদিন ছিলেন সার্কিট হাউসে। সংস্থার পক্ষ থেকে সমস্ত ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও
একদিন গিয়ে দেখি সামনে রাস্তার পাশে তাঁবু খাটানো একটি ছোট্ট চায়ের স্টলে হাতলভাঙ্গা চেয়ারে বসে চা খাচ্ছেন। সেখানে বসে চা খেতে খেতে বললাম, “হোটেলে তো আপনার জন্য সব ব্যবস্থাই করা আছে, তাহলে
এখানে বসে চা খাচ্ছেন কেন?”
তখন উত্তরে বললেন, “এখানে চা খেয়েই আমি আনন্দ পাই। এই একঘণ্টা ধরে চা খেতে খেতে
কত সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা হচ্ছে, জেনেছি কত জীবনের টুকরো
কথা। হোটেলে কি সেইসব পাওয়া যাবে? তাছাড়া একটা সংস্থা
প্লেনের টিকিট কেটে আমাকে এনেছে, হোটেলে রেখেছে। কত খরচ।”
কথা শুনতে শুনতে আমি
ভাবছিলাম কত বড়ো মনের অধিকারী তিনি, মানুষের
জন্য কত ভাবেন, কতটা সহজ সরল তিনি। সে-বার অনুষ্ঠান হয়েছিল
আগরতলা নজরুল কলাক্ষেত্রে। প্রায় একঘণ্টা টানা ছড়া মুখস্থ বলে গেছেন। শিশুদের
হাসি ও হাততালিতে সু-উজ্বল হয়েছিল সে হল। কী স্মৃতিশক্তি তাঁর!
দুটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে।
একবার কৈলাশহর যাই একটা কাজে। আবৃত্তি শিল্পী সুতপা রায়ের আবৃত্তি শেখানোর ক্লাসে
গিয়েছিলাম ছোটোদের সঙ্গে গল্প করতে। ছোটোরা তখন ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের দারুণ মজার
সব ছড়া পড়ছিল। কী যেন মনে করে আমি বললাম, “তোমরা যে
ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের ছড়া পড়ছ, তাঁকে আমি চিনি।”
তখন সব্বাই চাইল কবির
সঙ্গে যদি ফোনে একটু কথা বলা যায়। ছোটোরা ফোনে কবিকে তাঁর ছড়া পাঠ করে শোনাতে
চায়। ছোটোদের আগ্রহ দেখে আমি ফোন করে ভবানীপ্রসাদকে বললাম, “আমি এখন কৈলাশহরে আছি। সুতপা রায়ের আবৃত্তির স্কুলে। আপনার
ছড়া ওরা পাঠ করে শোনাতে চায় আপনাকে।”
এই কথা বলতেই দারুণ খুশি।—“অবশ্যই শুনব।”
হ্যাঁ, সেইদিন তিনি শুধু ছোটোদের আবৃত্তি শুনলেনই না, নিজেও প্রায় দশ মিনিট দারুণ দারুণ মজার ছড়া পাঠ করে ফোনে ছোটোদের
শোনালেন।
তেমনি একদিন ফোনে
কথাপ্রসঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুর বাদলপুর 'চতুর্দোলা' কাগজের
সহ-সম্পাদক বললেন তেমনি একটি ঘটনার কথা। ছোটোদের ছড়াপাঠের প্রতিযোগিতা চলছে। তিনি
ছিলেন বিচারক। পাঠ হচ্ছে ভবানীপ্রসাদের ছড়া। হল-ভরতি ছাত্র-ছাত্রী। মাইকে পড়ছে
সবাই। সুব্রতবাবু হঠাৎ বললেন, “তোমরা যাঁর ছড়াপাঠ করছ তাঁর
কণ্ঠে ছড়া শুনেছ কোনোদিন?”
না, কেউ শোনেনি। সুব্রতবাবু তখন বললেন, “দেখি
ফোনে যদি ভবানীদাকে পেয়ে যাই তাহলে কবি কণ্ঠে আজ সবাই শুনতে পাবে তাঁর মজার
দু-তিনটা কবিতা।” বলেই ফোন করলেন।
ভবানীপ্রসাদ মজুমদার ফোন
ধরে বললেন, “ভাই, এখন
লোডশেডিং চলছে। আচ্ছা একটু ধরো, মোমটা জ্বালিয়ে নিচ্ছি।
ছোটোরা শুনতে চাইলে তাদের তো আর না করা যায় না।” বলে তিনি
মোম জ্বালিয়ে বললেন, “কীভাবে ফোনে ছড়া ছেলেমেয়েদের শোনাবে?”
সুব্রত মাইতি বললেন, “দাদা, ফোনটা আমি মাইকের স্পিকারের
সামনে ধরব, তখন সবাই শুনতে পাবে।”
তাই হল। ভবানীপ্রসাদ
সেইদিন লোডশেডিংয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে হাওড়ার বাড়ি থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের
ছেলেমেয়েদের কবিতা শুনিয়েছিলেন যেমন শুনিয়েছিলেন ত্রিপুরার বহু গুণমুগ্ধ
ছেলেমেয়েদেরও। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ছিল বলেই এত এত ছড়া শিশুদের জন্যে লিখে
আনন্দ পান তিনি।
সন্দেশ এবং সত্যজিৎ রায়
দেখেছিলেন সুকুমার রায়ের পর এ-সময় শিশুতোষ ছড়ায় সিদ্ধহস্ত ভবানীপ্রসাদ মজুমদার়, হয়তো তাই সুকুমার রায় শতবর্ষে সুকুমার রায় পদক তিনি ভবানীপ্রসাদ
মজুমদারের গলায় নিজ হস্তে পরিয়ে দিয়েছিলেন।
<
সূচিপত্র