তিমি ছাড়াও আছে তারা মাছ, সীল মাছ কিংবা অতি পরিচিত চিংড়ি মাছ। সেই ভাবে
তিমি মাছ লিখতে পারতাম। লিখলাম না এই কারণে যে, এটি একটি বিজ্ঞান প্রবন্ধ। বিজ্ঞান সিদ্ধান্তে এসেছে যে
তিমি 'মাছ' নয়। মাছ নয় তো কী? এই প্রশ্নের
উত্তরে বিজ্ঞান জানালো যে,
তিমি হলো
স্তন্যপায়ী প্রাণী। এমন ভাবে কথাটা পাঠ্যপুস্তকে বিস্তার লাভ করল যে মনে হবে মাছ
না হলেই বুঝি স্তন্যপায়ী হবে। এই রকম বোঝার অবকাশ থাকে না, যদি বলা হয় জীবের
বিবর্তনে এককোষী প্রানী থেকে মানুষ হয়ে ওঠার পথে যে স্থূল বিভাগ গুলি রয়েছে সেখানে
মাছ আর স্তন্যপায়ী ছাড়াও রয়েছে আরো তিনটি বিভাগ। ক্রমান্বয়ে বললে হবে, মৎস, উভচর, সরীসৃপ, পক্ষী ও
স্তন্যপায়ী। এরা সবাই মেরুদণ্ডী প্রাণী। এক মাত্র স্তন্যপায়ী ছাড়া সবাই জন্ম নেয়
ডিম থেকে। এই নামগুলোর সঙ্গে কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে আছে। যেমন উভচর মানে
উভয়স্থানে বিচরণের ক্ষমতা থাকবে, পক্ষী মানে সে উড়তে পারবে -এইরকম। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগে
যে, উভচর হোক বা খেচর
পাখিই হোক তার মায়ের দুধ খেতে বাধাটা কোথায়? তাই উভচর বা পাখির বিচরণ ক্ষমতা তার প্রধান বৈশিষ্ট্য নয়।
প্রাণীকূল এক একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য অর্জন করে বিবর্তিত হয়েছে। তিমির মধ্যে এমন সব
বৈশিষ্ট্য আছে যার ফলে সে বিবর্তনের শেষ ধাপে নাম লেখাতে পেরেছে অথচ তার বাসস্থান
ছাড়তে পারেনি এখনো। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে সে মাছের মতোই । তাই তিমির উঠলেই বলতে
ইচ্ছা করে ' তিমি মাছ '।
তিমির অনেক প্রজাতি আছে। প্রজাতিভেদে এদের আকৃতিও আলাদা হয়।
তবে আমরা প্রথমে তিমির বিশালতা নিয়ে বিস্মিত হই বলে সর্ববৃহৎ নীল তিমি নিয়ে
আলোচনায় বেশি আগ্রহী। এরা লম্বায় একশো ফুটের কাছাকাছি যেতে পারে আর ওজনে সাতটা
হাতির তুলনীয় হয়। সবচেয়ে ছোট প্রজাতির তিমি হয় দশ ফুটের মতো। নীল তিমির মতো অতবড়
প্রাণী জলে কেন ডাঙাতেও নেই। জলের রাজা সে। কিন্তু খাবার বেলায় ছোট ছোট চিংড়ি
জাতীয় প্রাণী ছাড়া খাবার উপায় নেই। কেউ কেউ ছোট ছোট মাছ খেতে পারে। কেননা এদের
মুখের মধ্যে রয়েছে একটা হাড়ের ছাঁকনি, যাকে বলা হয় বেলিন প্লেট (Baleen Plate); এর মধ্য দিয়ে বড়ো
মাছ প্রবেশ করতে পারে না। চোখের সামনে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে বিচিত্র সব মাছ অথচ
খাওয়ার উপায় নেই, এ যেন ডায়াবেটিস
রোগীর কাছে রসগোল্লার হাঁড়ির উপস্থিতি। খাওয়ার ব্যাপার তো এই, এবার বলি ঘুমানোর
ব্যাপার। নিশ্চিন্তে ঘুমানোর উপায় তার নেই। না, কোন শত্রুর ভয়ে পলে পলে ঘুম ভেঙে যায় না। তার সঙ্গে শত্রুতা
করার সাহসই বা কার থাকবে! আসলে তার বিপত্তি হলো শ্বাস গ্রহনের। জলজ অন্য প্রাণীর
মতো তার ফুলকা নেই আছে ফুলকার থেকে আরো দামী যন্ত্র ফুসফুস। কিন্তু হলে হবে কি, জলের মধ্যে
ফুসফুসের কাজ করার ক্ষমতা নেই যে! তাই তিমিকে জলের উপরে ভেসে উঠতে হয় কিছুক্ষণ
পরপর। আবার এর জন্য তার অবস্থান জেনে যায় শিকারীর দল। যারা মাংস, চর্বি আর মুখের
ভিতরকার হাড়ের লোভে নির্বিচারে তিমি হত্যা করে। ধারালো হারপুন একবার বিদ্ধ করে
তাকে কাবু করা যেতো না। কিন্তু তাকে যে বাধ্য হয়ে শ্বাস গ্রহনের জন্য ভেসে উঠতে
হবে! তখন স্তন্যপায়ী মানুষ তারই সম পর্যায়ের স্তন্যপায়ী প্রাণী তিমির দূর্বলতার
সুযোগে বারংবার আঘাত করতে থাকে। তখন মনে হয়, তিমি যদি ডাঙাতে বাস করত, মানুষ কি পারত এমন ভাবে হত্যা করতে?
এবার প্রশ্ন জাগে তিমি কেন ডাঙায় বাস করার চেষ্টা করল না।
অন্য প্রাণী ধীরে ধীরে লক্ষ লক্ষ বছরের প্রচেষ্টায় ফুসফুস তৈরি করে ডাঙায় উঠেছে, আবার কেউ পা
দু’টোকে ডানায় রূপান্তরিত করে আকাশ জয় করে পাখি নামের এক মহাশ্রেণী সৃষ্টি করেছে।
তিমি যে তিমিরে সেই তিমিরেই কি রয়ে যাবে?
এবার ভাবতে হবে একটু বিপরীত ভাবে। অন্য প্রাণীদের প্রচেষ্টা
ছিল কীভাবে ডাঙায় উঠবে।
এই আকাঙ্খায়
তাদের ফুলকার পরিবর্তে ফুসফুস এসেছে। কিন্তু তিমির পূর্বপুরুষের গোড়া থেকেই ফুসফুস
ছিল। তারা চারপায়ে হাঁটত আর ডাঙায় বসবাস করত। কীসের আশায় তারা জলে বাস করার মত
সমাজ বিরূদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলতে পারব না। তবে প্রকৃতি তার ইচ্ছায় জল ঢেলে
দেয়নি বরং জলে থাকার জন্য যতদূর সাহায্য করা যায় তা' করেছে। সাঁতার কাটার জন্য সামনের পা দুটিকে
পাখনায় রূপান্তরিত করেছে। পিছনের পা দুটিকে দিয়েছে একেবারে বিলুপ্ত করে। তবে শিরায়
উপশিরায় গরম রক্তের পরিবর্তে ঠাণ্ডা রক্তের আমদানি করল না। পরিবর্তে চামড়ার নীচে
পুরু চর্বির আস্তরণ তৈরি করে তাপ সঞ্চালনকে কমিয়ে দিল।
এসব ঘটেছে লক্ষ লক্ষ বছরের প্রচেষ্টায়। আগামী আরও লক্ষ বছর
পরে যদি ফুসফুসের সঙ্গে কিংবা ফুসফুসের পরিবর্তে ফুলকার সৃষ্টি হয় তবে বারে বারে
তাকে জলের উপরে ভেসে উঠে মনুষ্যজাতির কাছে সম্ভ্রম নষ্ট করতে হবে না। কিন্তু একটা
কথাই মনে হয় সেটা কি তিমির মত বৃহৎ প্রাণীর ক্ষেত্রে গৌরবের বিষয় হবে? সেটাকে কি সঠিক
অর্থে বিবর্তন বলতে পারব?
নাকি বলতে হবে
অপবর্তন? শেষ পর্যন্ত
প্রকৃতির ব্যতিক্রমী ঘটনার দায় নিতে হবে বেচারা তিমিকেই?