গল্প - ৪ । আশ্বিন - ১৪৩১




            ভয়   











মৌ দাশগুপ্ত
কাটনী, মধ্যপ্রদেশ



 

তখন আমি এম এস সি পড়ছি। পুজোর আগে সুতোহাটায় মাসীর বাড়ি গেছি পুজোর জামাকাপড় নিয়ে। জন্মাবধি কলকাতায় আছি বলে মাঝেমধ্যে সবুজ গ্রাম্য পরিবেশ ছেড়ে মন যেতে চায়না। সমবয়সী মাসতুতো ভাই কাজলের সাথে বেশ টোটো কোম্পানীর ম্যানেজার হয়ে এদিকওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের পাড়ার তাপুদা কাছেই কুকড়াহাটির সরকারি হাসপাতালে জয়েন করেছে প্রায় বছর দুয়েক হল। ভাবলাম দেখা করে আসি। তাপুদার সাথে অনেকদিন পরে দেখাও হবে আবার ঘোরাও হবে

যা ভাবা তাই করা। কাজলকে নিয়ে কুকড়াহাটি গেলাম। কাজল স্থানীয় ছেলে। সোজা নিয়ে গেল তাপুদার কোয়াটারে। তাপুদা তখন দরজায় তালা দিয়ে গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে সবে বোধহয় হাসপাতালেই রাউন্ড দিতে যাচ্ছে। আমাদের দুমূর্তিকে হঠাৎ কে দেখে যুগপৎ অবাক আর খুশি হয়ে বলল,

আরে বিল্লিরাণী যে, তুই কোথ্থেকে টপকালি? সঙ্গে এটা কে?

তাপুদা ছোটবেলা থেকেই আমায় বিল্লিরাণী বলে কিন্তু কাজল নামটা শুনে যা ফিকফিক করে হাসছে তাতে আই ডি পি ডি হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বললাম,

সুতাহাটায় মাসীর বাড়ি এসেছি গো তাপুদা ভাবলাম তোমার সাথেও একটু দেখা করে যাই। এ আমার মাসতুতো ভাই কাজল।

আমার আধঘন্টার মত কাজ আছে হসপিটালে। তোরাও চল। একটু বসবি ওখানে তারপর একসাথে ফিরে জমিয়ে আড্ডা মারব। বাডিতে বলে এসেছিস তো? দুপুরের খাওয়াটা এখানেই করে নে আজ। হাঁসের ডিমের খিচুড়ি, পোস্ত বড়া, ঝুরঝুরে আলুভাজা আর কাঁকড়ার ঝাল খাওয়াবো তাহলে। আমাদের রান্নার মাসী যা দারুন রাঁধে না। না খেলে পস্তাবি কিন্তু বলে দিলাম।

মেনু শুনেই জিভে জল আসছিলো আপত্তি করে নিজের পায়ে কুড়ুল মারি আর কি। তাপুদার সাথে চললাম হাসপাতালের দিকে। ছোট গ্রামীণ হাসপাতাল। বর্গক্ষেত্রের চারটে বাহুর একটা ছেঁটে নিলে যেমন দেখায় সেরকম দেখতে অনেকটা। পিচের চওড়া রাস্তা থেকে নেমে সরু লাল মোরামের রাস্তা দিয়ে খানিটা হেঁটে গেলে লোহার গ্রীলের গেট। গেটের ওধারেও সরু মোরামের রাস্তা, শেষ হয়েছে একতলা হসপিটাল বিল্ডিংএ। রাস্তার দুপাশে সবুজ ঘাস। ইঊ শেপের বিল্ডিংএর সামনে বাখারির বেড়া দিয়ে ঘেরা জমিতে সবুজ বাহারি গাছ। আমি জীবনে কোনদিন এত সবুজ, এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হাসপাতাল দেখিনি। গেটের ঠিক বাইরে ছোট ছোট চায়ের দোকান, ফলের দোকান, পাইস হোটেল, ছোট স্টেশনারি দোকান। একটা ওষুধের দোকান। ঠিক এক জায়গায় নয় দোকানগুলো, কেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কয়েকটা সাইকেলরিক্সা আর অটোও নজরে এল। এক জায়গায় বেশ জটলামত। বেশ কয়েকজন লোক কিছু একটা বা কাউকে ঘিরে সমস্বরে চেঁচামেচি করছে। তাপুদার পিছনপিছন ভীড়ে ঢুকে দেখি কি একটা ভীষণ রোগা আধময়লা লোক কাঠের উঁচুমত পিঁড়িতে মাথা নীচু করে বসে। অবিচলিতভাবে দুটো হাঁটু জড় করে দুহাতের বেড় দিয়ে ধরে বসে। পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁটছে। সামনে বিছানো পলিথিন শীটের ওপর কয়েকটা জুঁই রজনীগন্ধা বেলিফুলের সাদামালা, ধূপকাঠি… এইসব। তাপুদাকে চেনে বলেই বোধহয় চেঁচামেচিটা বন্ধ হয়ে গেল। একটা বুড়ো মত দেখতে লোক এগিয়ে এসে বলল

- ‘দ্যাখো ডাক্তারবাবু এ ভুতের ছা আবার দোকান খুলে বসেছে। তখন থেকে উঠে যেতে কইছি তো গেরাজ্জিই করছে না। এবার কেউ মল্লে কিন্তু এ ব্যাটাকে পিটায়ে লাশ বানায়ে দেব। ভালোয় ভালোয় শয়তানটারে উটতে বলে দাও।

এই তুমি আবার এসেছো? তোমায় বারণ করেছি না আসতে?

লোকটা চোখ তুলে তাকাল তাপুদার দিকে। উফফফ ঐ রকম অস্বাভাবিক সাদা চোখ আমি জীবনে কারোর দেখিনি। মরা মাছের মত প্রাণহীন চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে লোকটা ওর দোকান পাট গোটাতে লাগলো।

হরি তুমি দেখো ওকে যেন হাসপাতালের ত্রি সীমানায় না দেখি কোনদিন। এবার কিন্তু তাহলে পুলিশ ডাকবো আমি বলে দিলাম।

কথাগুলো বেশ কড়া গলায় বলে তাপুদা আমাদের নিয়ে ওর নাম লেখা ছোট একটা ঘরে এনে বসালো আমাদের। লাইট ফ্যান চালিয়ে ঘরের পর্দাগুলো সরিয়ে বলল,

তোরা আধ ঘন্টাটাক বোস, আমি আসছি।

ঐ লোকটা কে গো তাপুদা? কি ভয়ঙ্কর তাকানো লোকটার।

কে জানে কে। স্থানীয়কেউই ওকে চেনেনা। হঠাৎ করে কোথা থেকে না জানি এসে বসছে সাদা মালা নিয়ে। রোজ আসেনা। হঠাৎ করে মাঝেমধ্য আসে। এখানকর সবাই বলে ও যেদিন দোকান খুলে এসে বসে সেদিনই হাসপাতালে কেউ না কেউ মারা যায়। আর মিথ্যে বলবনা বিল্লী ব্যাপারটা সত্যি। তুই জানিস আমি অলৌকিক কিছু বা অধিভৌতিক কিছুতে কোনদিনই বিশ্বাস করিনা কিন্তু সেই আমিও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে কিছু একটা অবশ্যই আছে।

তাপুদা হেন ডাকাবুকোর মুখে এ রকম ব্যাখান শুনে এমন ব্যোমকে গেলাম যে আধঘন্টাক পরে তাপুদা যখন ফিরে আসলো তখনও আমি আর কাজল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হা করে এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপে বসে আছি। তাপুদা এসে মুখ কালো করে বলল ওদের মেটারনিটি ওয়ার্ডে একটা বছর উনিশের সদ্য মা হওয়া তরুণী হঠাৎ করে শ্বাসকষ্টজনিত অসুখে মারা গেছে।বাচ্চাটাকেও বাঁচানো যায়নি। মেয়েটার বাড়ীর লোকেরা ঐ ফুলওয়ালাকে মারবে বলে খুঁজছে। মনটা এত খারাপ হয়ে গেল যে না খেয়েই ফেরত চলে এসেছিলাম সেদিন। তারপর ঘটনাপ্রবাহে সময়ের সাথে লোকটার কথা ভুলেই গেছিলাম। অনেক বছর পরে পুজোর সময়ই আবার বাড়ি গেছি। সাথে কর্তা, দুই মেয়ে। বছরে এই একবারই এখন ভিনরাজ্য থেকে বাড়ি আসি। আসার পর থেকেই ছোটমেয়েটার ধুমজ্বর। ষষ্ঠির দিন ডাক্তার কোথায় পাবো ভাবছি, মা বললেন,

আরে আমাদের রাধিদির মেজছেলে তাপুটা তো পাড়াতেই চেম্বার খুলেছে। একটু আগেও তো দেখলাম রাস্তায় দাড়িয়ে কথা বলছিল কার সাথে। ওদের বাড়িতেই চলে যা না।

ওমা, তাপুদা, তা আগে বলবে তো।

তাপুদা বাড়িতেই ছিল। মেয়েকে দেখে বলল সাধারন সর্দিজ্বর। টনসিলটাও ফুলেছে। ওষুধ লিখে দিল। তাপুদার বৌ পুজোর দিন তো কিছু না খাইয়ে ছাড়বেনা। রাধিমাসিমার হাতে বানানো বিখ্যাত ডালবড়া কুচো নিমকি সহকারে চা খেতে খেতে বললাম,

তাপুদা সেই লোকটাকে আর কোনদিন দেখেছিলে?

কোন লোকটা রে বিল্লী?

ঐ যে গো কুকড়াহাটির হাসপাতালের সামনে যেদিনই সাদা মালা বেচতে আসতো সেদিন ই কেউ না কেউ মারা যেত।

তোর মনে আছে?

হ্যাঁগো। তাই তো জানতে চাইছি।

আমার ওখানে পাঁচ বছরের পোস্টিং ছিল বুঝলি তো? তা আমি থাকতে থাকতেই ঐ জেটির কাছে অনেকটা জমি নিয়ে সেভেনটি টু বেডের আই সি ইউ ফেসিলিটি নিয়ে নতুন একটা বিল্ডিং বানানো হয়। আগের বিল্ডিংটা ফাঁকাই পড়ে থাকত। এম্বুলেন্স গ্যারেজ আর মর্গটা শুধু সরানো হয়নি। তবে লোকজন দরকার ছাড়া ওদিকটায় বিশেষ যেতনা। দোকানগুলোও নতুন বিল্ডিংএর আশেপাশে উঠে এসেছিল কিনা। আমি যেদিন বেরিয়ে আসব তার দিন দুয়েক আগে কি একটা যেন দরকারে পুরোনো হসপিটালের দিকে যাচ্ছি। দেখি ঐ লোকটা, বুঝলি, ঠিক ঐভাবে মালা নিয়ে বসে আছে। আর সেদিন লোকটার সামনে ছিল ঠিক একটা মালা। আমার পরিস্কার মনে আছে। কত রাত মর্গে থেকেছি, মরা কেটেছি, তবু হঠাৎ গা’টা কেমন ছমছম করে উঠলো। আশেপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা। ভাবলাম নতুন বিল্ডিং থেকে কাউকে ডেকে এনে ব্যাটাকে ভাগিয়ে দিই। ঘুরে পিচরাস্তায় এসে খানিকটা হাঁটার পরই দেখি আমাদের একটা এম্বুলেন্স আসছে। আমায় দেখে ড্রাইভার গাড়ি থামালো। ওকে বললাম। ওতো ওদিকেই যাচ্ছিল, আমাকেও তুলে নিল। গিয়ে দেখি লোকটা শুয়ে পড়েছে। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ভাগাবো ভেবে কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি ও বাবা এতো কাঠমরা। পিঁপড়ে ধরে গেছে।ইঁদুর টিঁদুরেও খুবলে খেয়ে গেছে কিছুটা। বাতাসে মানুষপচা দুর্গন্ধ। বুকের ওপর রাখা সাদা বেলিফুলের মালাটা কিন্তু একদম টাটকা। আমি কিন্তু কয়েক মিনিট আগেই ঐ মালাটার সামনে উবু হয়ে বসে লোকটাকে দুলতে দেখে গেছি। বিশ্বাস কর।

স্পষ্ট দেখলাম কেমন শিউরে উঠল তাপুদা। তারপে চুপ করে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রইল জানালা দিয়ে। বাইরে প্যান্ডেলে গান বজছে। ঘরের ভিতর বৌদির জলখাবার বানানোর টুংটাং আওয়াজ, বারান্দার দেওয়ালজোড়া একোরিয়ামের সামনে থেকে রাধিমাসি আর আমার ছুটকির হাসির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তবু কুকড়াহাটি থেকে অনেকদুরে বসে এতবছর পরেও আমার গায়ে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠল। মনে পড়ল কি রকম অস্বাভাবিক সাদা চোখ ছিল লোকটার আর সে চোখে কি অদ্ভুত মরা মাছের মত প্রাণহীন দৃষ্টি। রাধিমাসির অত মুখরোচক ডালবড়াটাও কেমন তিতকুটে লাগছিল আমার।