গল্প - ১ । চৈত্র ১৪৩১





 ঠাকুরমার ঝুলি





সুস্মিতা নাথ

গুয়াহাটি, আসাম



 

তারকাঁটায় লটকে থাকা ঝুলিটার দিকে তাকিয়ে ঠাকুরমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কতদিন যে ওটাতে হাত পড়েনি! অনাদরে অবহেলায় ঝুলিটার জরাজীর্ণ দশা। দেখলেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। কে বলবে এই সেই বিখ্যাত ‘ঠাকুমার ঝুলি’!

যার ভিতরে থরে থরে সাজানো আছে অজস্র রূপকথা উপকথা বীরগাথা পুরাণগাথা ও মন ভাল করা আরও অসংখ্য গল্প! 

সেসব থেকে বেছে বেছে যখন গল্প শোনাতেন ঠাকুমা, তখন নাতি নাতনিদের মুখগুলো বিস্ময়ে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠত। ওদের চোখের তারায় ফুটে উঠত কল্পলোকের সাতরঙা আলো। নাতি নাতনিদের অমন তৃপ্ত উজ্জ্বল খুশিমাখা চাঁদপানা কচি মুখগুলো দেখে দেখেই কেটে যেত ঠাকুরমার কত শত দুপুর আর তারায় ভরা দীর্ঘ রাত। আহা! দিনগুলি কী আনন্দেরই না ছিল! ঠাকুরমা ও তাঁর ঝুলি, দুটোরই কদর ছিল অসীম। সে সব দিনের কথা ভাবলেই মনটা ভার হয়ে ওঠে এখন।      

এমন নয় যে গল্প ফুরিয়ে গেছে। ঝুলির ভেতরে রাজা-রানি, রাক্ষস-খোক্কস, ভূত-প্রেত, ব্যাঙ্গামা-ব্যাঙ্গামী, নীলপরি-লালপরি, দৈত্য দানবেরা এখনও দাপিয়ে বেড়ায়। এখনও ঠাকুরমা নাতি-নাতনিদের জন্যে অধীর অপেক্ষায় দুপুর জাগেন। এখনও শান্ত-দুরন্ত-দুষ্টু-মিষ্টি নাতি নাতনিরা আছে। কেবল ভেঙে গেছে গল্প বলার আসরটি। এখনের ছেলেমেয়েরা আর গল্পগাথায় আগ্রহী নয়। সুযোগ পেলেই ঠাকুমার কাছে ছুটে এসে গল্প শুনতে ভিড় জমায় না। তার বদলে টি-ভি দেখতে অথবা কম্পিউটার গেম খেলতেই বেশি ভালোবাসে। আর তো আছেই বড়দের মোবাইল ফোন। সেটা যেন রাজা সলোমনের গুপ্তধন। হাতে পেলে যেন বিশ্ব জগৎ হাতের মুঠোয় চলে আসে। স্কুল, টিউশন, ক্রিকেট কোচিং, আঁকা শেখা, নাচ শেখা, গান শেখা, ক্যারাটে শেখা, সাতার শেখা, ইত্যাদি হরেক তালিমের অবসরে ক্বচিৎ কদাচিৎ যে সময়টুকু মেলে, ওরা তখন হামলে পড়ে টি-ভির সামনে। কিংবা মজে যায় মোবাইল অথবা কম্পিউটারে। ঠাকুরমার কথা তখন ওদের মনেই পড়ে না। ঠাকুরমা আগ্রহী হয়ে কিছু বলতে গেলেও ওরা বলে ওঠে “ওফ ঠাম্মা! ডিস্টার্ব করো না, কার্টুনটা দেখতে দাও।” 

ঠাকুরমা দেখলেন, এতো ভয়ানক সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে! নাতিদের তো কাছেই পাওয়া যাচ্ছে না! প্রথমে ঠাকুমার মনে খানিক অভিমান দানা বেঁধেছিল। পরমূহূর্তেই অবশ্য অভিমান কেটে গিয়ে কেমন একটা জেদ চেপে বসল মনে। তাঁর নাতিটি তখন মগ্ন হয়ে টি-ভি দেখছিল। তিনি পা টিপে টিপে নাতির কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বললেন, “দাদাভাই এসো তোমাকে একটা খুব সুন্দর গল্প বলি।”

“উফ ঠাম্মা! ছাড়ো না। তুমি  আর তোমার যত আজব গল্প! সব পুরোনো পচা...।” নাতি আবারও বিরক্তি দেখিয়ে টি-ভির কার্টুনে মন দিল।

-- আমার গল্পটা কিন্তু এই কার্টুনের চাইতেও ভালো। ঠাকুরমা হাল না ছেড়ে বলেন।  

-- ধ্যুস! হতেই পারে না। অবিশ্বাসীর চোখে তাকায় নাতি। 

ঠাকুরমা বললে, “বিশ্বাস করো, ভারী সুন্দর গল্প।”

“হলেই কী হল?” তাচ্ছিল্য ভরে বলল তাঁর ক্ষুদে নাতিটি, “তোমার গল্প তো আর দেখা যাবে না। এই দ্যাখো না টি-ভিতে কেমন টম এন্ড জেরি, ছোটা ভীম, অ্যাভেঞ্জার্স, ট্র্যান্সফর্মারস, শক্তিমান, ... সব্বাইকে দেখা যায়, ওদের কথা শোনা যায়, ওরা কোথায় আছে, কী করছে স-অ-ব দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু তোমার গল্প তো কেবল শুনে বুঝতে হবে। দেখার উপায় নেই। কী বো-ও-ও-রিং!”         

“আমার গল্পও দেখতে পাবে,” ঠাকুরমা বললেন। “একটু চেষ্টা করলেই তুমি রাজা রানি দানব পরি বাঘ সিংহ সব্বাইকে দেখতে পাবে। শুধু আমি যখন গল্প বলব, তখন তুমি শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ করে খানিক ভাবতে চেষ্টা করবে, অমনি সব স্পষ্ট দেখতে শুরু করবে।”

“ধ্যাৎ, তাও আবার হয় নাকি? চোখ বুজে কেউ দেখতে পায়?” নাতির স্বরে অবিশ্বাস ঝরে পড়ে।

“খুব হয়, তুমি প্রমাণ করে দেখে নিও।” ঠাকুরমাও নাছোড়। এত সহজে হাল ছেড়ে দিতে তিনি নারাজ। বলে চললেন, “আজই তোমায় একটা গল্প বলব, আর তুমি চোখ বুজে দেখো, দেখতে পাও কি না।” রহস্যময়ীর হাসি হাসেন ঠাকুমা।   

-- কখন বলবে? 

-- তুমি যখন শুনতে চাও। 

-- আজ রাতে ঘুমোনোর আগে। তখন বলবে তো?

-- নিশ্চয়ই বলব। 

নাতি টি-ভি থেকে মুখ ফিরিয়ে আনন্দে ঘাড় নাড়ে। অর্থাৎ সে-ও গল্প শোনার অপেক্ষায় আছে।  

ঠাকুরমা আজ খুব খুশি। নাতি তাঁর অনেক অনেক দিন পরে গল্প শুনবে। মনের ভেতরে আনন্দের ঝাঁপিটা যেন উপচে পড়ছে। ঠাকুরমা নিজের ঘরে এসে ঝুলিটা নামিয়ে নিলেন। বহুদিন একই ভাবে ঝুলে থাকার জন্যে ধুলো ময়লা জমে ওটার একাকার অবস্থা। তিনি ধীরে ধীরে সেটাকে ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করে তোলেন। তারপর সেটা খুলে পরম যত্নে বের করে আনেন গল্প। নাতিকে বলার জন্যে সেরা একটি গল্প। 

রাত গাঢ় হয়েছে। আকাশ জুড়ে রূপোর চাকতির মতো একখানা চাঁদ উঠেছে।  তারই জ্যোৎস্না ঘরের জানলা গলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকেছে। ঠাকুরমার বিছানা এখন চাঁদের আলোয় মাখামাখি। আর সেখানেই শুয়ে আছে ঠাকুমার আদরের চাঁদমুখো নাতি। ঠাকুরমা ওর মাথাভর্তি একরাশ চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন, “দ্যাখো ভাই, কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে! আজ তোমাকে তাহলে চাঁদের বুড়ির গল্প শোনাই।” 

-- কোন বুড়ি? 

-- চাঁদ-বুড়ি। যে কিনা চাঁদে থাকে। ওখানে বসে বসে অনবরত চরকায় সুতো কেটে চলে। 

-- ধ্যাৎ, চাঁদে আবার কেউ থাকে নাকি? ওখানে তো অক্সিজেন নেই। 

-- কিন্তু চাঁদবুড়ি তো ওখানেই…

“না না ঠাম্মা, তুমি জানো না। চাঁদে কোনও প্রাণী থাকতে পারে না। ওখানে যে বাতাসই নেই। শ্বাস নেবে কী করে?” ঠাকুরমা কথা শেষ করার আগেই নাতি বলে উঠল।   

ঠাকুরমা এবার চমকে উঠেছেন। তাঁর নাতিটা এত কিছু জেনে ফেলেছে! মনে মনে বেজায় অবাক তিনি। খুশিও হলেন খুব। তারপরেই প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, “তাহলে অন্য গল্প বলি? পরিদের গল্প?”

-- পরিদের গল্প? পরিরা কেমন হয়?

-- পরিরা খুব ভালো হয়। ভালো ছেলেমেয়েদের ওরা খুব ভালোবাসে।

-- ওরা কোথায় থাকে? 

-- ওরা অনেক অনেক দূরের দেশে থাকে।

-- তবে আসে কী করে? 

-- আকাশ পথে উড়ে উড়ে। 

-- ওরা কি পাখি?

-- না না পাখি নয়। একদম মানুষের মতোই দেখতে। তবে পাখির মতো ওদেরও দু’টো করে ডানা থাকে। প্রজাপতির মতো রঙবেরঙের ডানা। 

-- তাই বুঝি? মানুষ আবার পাখির মতো? তা হলে নিশ্চয়ই ওরা এলিয়েন। 

-- এলিয়েন আবার কী? ঠাকুরমা বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেন। 

-- এলিয়েন বুঝলে না? এলিয়েন মানে হল ভিনগ্রহী প্রাণী। পরিরাও নিশ্চয়ই অন্য কোনও গ্রহ থেকেই আকাশপথে আমাদের পৃথিবীতে চলে আসে।  

নাতির কথা শুনে ঠাকুরমা হাসেন। সত্যি তাঁর ছোট্ট নাতিটি কত কিছু ভাবতে শিখেছে! 

নাতি আবার বলে ওঠে, “ও ঠাম্মা, তুমি ইউ-এফ-ও দেখেছ? উড়ন্ত চাকী?”

-- না দাদুভাই, তা তো দেখিনি। 

-- আমিও দেখিনি। তবে উড়ন্ত চাকীরা আসে। এলিয়েনরা আমাদের পৃথিবী দেখতে চুপি চুপি আসে। উড়ন্ত চাকীতে চড়েই হয়ত তোমার পরিরাও আসে, তাই না? 

ঠাকুরমা বলেন, “হয়তো তাই। হয়তো তোমার কথাই ঠিক ভাই।” 

নাতি তখন মস্ত হাই তুলে ঘুম জড়ানো চোখে বলে, “তুমি তবে এলিয়েনের গল্পই বলো ঠাম্মা। মানে ওই পরিদের গল্প।” 

-- শোনাবো ভাই, তবে আজ আর নয়। তোমার ঘুম পেয়ে গেছে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো। কাল তুমি ইশকুল থেকে ফেরার পরে আমি তোমাকে গল্প শোনাবো। 

-- এলিয়েনের গল্প?

ঠাকুরমা হেসে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানান। নাতি আবারও বলে, “শোনাবে তো? প্রমিস?”

ঠাকুরমা ছোট্ট একটা হামি খেয়ে বলেন, “নিশ্চয়ই শোনাবো। তিন সত্যি কেটে বলছি।” 

নাতি তখন খুশি হয়ে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে। নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঠাকুরমা ভাবেন, এবারে তাঁর গল্পের ঝুলি নতুন করে সাজাতে হবে। দিন বদলেছে। সাত সাগর তেরো নদী পেরিয়ে তেপান্তরের মাঠ আর দূর এবং দুর্গম নয়। বস্তুত অনেক কিছুই আর অধরা থেকে যায়নি এই প্রজন্মের নাতি নাতনিদের কাছে। তাঁর নাতির চোখে কল্পনা যেমন আছে, তেমনি বিজ্ঞান ও বাস্তবের জ্ঞানও সঞ্চারিত হয়ে চলেছে নিজের মতো করে। কাজেই এমন গল্প ওকে শোনাতে হবে, যা ওর কল্পলোকের রসদ যেমন জোগায়, তেমনি মনের তৃষ্ণা ও জ্ঞান পিপাসাও যেন মেটাতে পারে।  

নাতি ঘুমোলে ঠাকুরমা উঠে বসেন। তারপর তাঁর সাধের ঝুলিটা থেকে প্রতিটা গল্পকে বের করে এনে সারারাত ধরে সেগুলোকে নতুন সাজে সাজাতে থাকেন। একেবারে তাঁর নাতির মনের মতো, প্রত্যাশা মতো করে। টি-ভি, কম্পিউটার, ও মোবাইল ফোনের মতো নিছক যন্ত্রদের কাছে কিছুতেই তিনি নিজেকে হেরে যেতে দেবেন না।