জানা অজানা । চৈত্র ১৪৩১



 বন্ধু বিবেকানন্দ










সুদীপ্ত শেখর পাল

কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ




 

আমাদের সমাজে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নানা ভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।  পারিবারিক ও আত্মীয়তার বাইরে যে সব সম্পর্ক থাকে তার অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রের পদ মর্যাদার  সম্পর্ক। এর বাইরে যে সম্পর্ক পড়ে থাকে সেটা হল বন্ধুত্ব।  

আবার বন্ধুত্ব এমন সম্পর্ক যে,  তার বৈশিষ্ট্য ছড়িয়ে থাকতে পারে জাগতিক অন্য যে কোন সম্পর্কের মধ্যে। কী আছে সেই সম্পর্কে। চাণক্য পণ্ডিতের কথায়..... উৎসবে, রাজদরবারে এমনকি শ্মশানেও যে সঙ্গী হয়অর্থাৎ সর্বত্র যাকে পাওয়া যায়,  সেই  বন্ধু।  

বিবেকানন্দের মধ্যে আমরা এর অভূতপূর্ব সার্থকতা দেখতে পাই। অনুসন্ধান করতে হয় না, এমনি এসে দেখা দেয় তাঁর বন্ধু সুলভ আচরণ, ছোট বেলা থেকে, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যাছিল সমানভাবে গতিশীল।  

শিশু যখন প্রথম পরিবারের ঘেরাটোপ থেকে পরিবেশে মিশতে শুরু করে তখন তার খেলার সাথীরাই তার বন্ধু। নরেন্দ্রনাথও খেলা করতেন সাথীদের সঙ্গে। সেই খেলার মধ্যে তাঁর নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা প্রকাশ পেত। খেলা নির্বাচন যেমন করতেন তেমনি খেলা উদ্ভাবনও করতেন। একদিন বললেন ধ্যান খেলা হবে। মুখে  বললেন বটে তবে খেলাকে নিছক খেলা হিসাবে নিলেন না। এমন ভাবে ধ্যানে মগ্ন হলেন যে সাপের উপস্থিতি মশার কামড় তাঁকে মন:সংযোগের ব্যাঘাত করতে পারে নি। একবার কোন এক খেলায় কোন ছেলে নিয়ম মেনে খেলার মোড় দিতে চাইছিল না। ঘাড়ে ধরে তাকে মোড় দিতে বাধ্য করালেন। বন্ধু বলে যে সব সময় ইয়ার্কি যুক্ত ব্যবহার করতে হবে এমন নয়। প্রেমের সঙ্গে শাসন করাও সম্ভব।  

স্কুল কলেজের বন্ধুত্ব জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এই সময়ে সঙ্গ দোষে বহু মেধাবী ছাত্রের নৈতিক অধ:পতনের ঘটনা আমরা অনেক শুনে থাকি। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ ছিলেন এর ব্যতিক্রমী চরিত্রের জ্বলন্ত উদাহরণ। যখন তিনি শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে পরিচিত হয়ে জীবনের এক নতুনতর আস্বাদন পাচ্ছেন, সেই সময় চাইলেন তাঁর সহপাঠীরাও যেন অনুরূপ আনন্দ লাভ করতে পারে। নিয়ে যেতেন বটে কিন্তু তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাব ধারণ করার উপযুক্ত ক্ষমতা না থাকায় শ্রীশ্রীঠাকুরের কৃপা থেকে বঞ্চিত হতে হতো। এই নিয়ে নরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তর্কও করতেন। থেকে বোঝা যায় তিনি বন্ধুদের কত ভালবাসতেন। 

অর্থ সাহায্য করে পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের প্রকাশ দেখা গেছে তাঁর মধ্যে। আমেরিকায় থাকা কালীন এক গুজরাটী ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র তাঁকে অর্থাভাবের কথা জানায়। কারণ তার বাড়ি থেকে মাস দুই কোন টাকা যায়নি। স্বামীজী (নরেন্দ্রনাথ) সঙ্গে সঙ্গে পকেট খালি করে প্রায় চল্লিশ ডলার তাকে দিয়ে দেন। 

তিনি ছিলেন কোন কাজে আগে ঝাঁপ দেওয়া নেতা। শ্রীশ্রীঠাকুর যখন কাশীপুরের বাগানে বাস করছিলেন তখন বিশেষ বারো জন ভক্ত সংসার ত্যাগ করে সেবা কার্য্যে নিজেদের উৎসর্গ করার সংকল্প করেছিলেন তাঁদের মধ্যে এগারো জনই ছিলেন যুবক, প্রায় সমবয়সী। আর তাঁদের মধ্যমণি ছিলেন নরেন্দ্রনাথ। একদিন পৌষের রাতে তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে বাগানে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ শুকনো ডাল পালা একত্র করে আগুন জ্বালিয়ে দিতে বললেন। সেই আগুনের সামনে বন্ধুদের আহ্বান জানালেন –আয় আমরা আমাদের সব বাসনা আগুনে আহুতি দিই। তিনি নিজে এবং তাঁর বন্ধুরা শুকনো কাঠ কুড়িয়ে আগুনে ফেলতে লাগলেন নিজেদের বাসনার প্রতীক রূপে। ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান, কিন্তু কী ব্যপক তার মাহাত্ম্য। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সাধনায় এগিয়ে যাওয়ার এমন দৃষ্টান্ত জগতে বিরল

 


আরও পড়ুন  -

দর্শন

 

শূন্যের আবিস্কার ও গুরুত্ব 



ধীরে ধীরে জ্ঞানের গভীরে


ছবি আঁকার পথে মানুষের বিচরণ


বেচারা তিমি


নানা রকম দেখা


মাধ্যাকর্ষণের পথ ধরে


ইংরাজি ভাষা ও তার অক্ষর পরিচয়