বৈজ্ঞানিকের রান্নাঘর - ১০ । চৈত্র ১৪৩১



 চার চার নয়, শক্তির হোক জয়











অরূপ

বন্দ্যোপাধ্যায়

দিল্লি, এন সি আর 



 

লম্বা ছুটি কাটিয়ে অবশেষে কলকাতা থেকে দিল্লি ফিরে চলল রিয়া। তবে এবার একা নয়, পিসতুতো দাদা অর্কও চলেছে সঙ্গে। নেতাজি সুভাষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রিয়াকে ছাড়তে এসে পিসি হাতে কিছু টাকা দিয়ে জলভরা চোখে বলেছিলেন, “আবার আসিস মা। এই টাকাটা দিলাম, কিছু খেয়ে নিস দুটি ভাইবোনে। তাই বলে ওই জাঙ্ক ফুডগুলো গিলিস না যেন তোর দাদার পাল্লায় পড়ে।”


চেক-ইন করে সিকিউরিটি চেকের পর অর্ক বলে, “চল মায়ের দেওয়া টাকার সদগতি করি।বলেই সে সারিবদ্ধ রেস্তোরাঁর দিকে এগোতে থাকে

রিয়া মৃদু আপত্তি জানিয়ে বলে, “পিসি জাঙ্ক ফুড খেতে বারণ করেছে না?”

ছাড় তো! মা তো আর দেখতে যাচ্ছে না। আর এয়ারপোর্টে জাঙ্ক ছাড়া আর কী পাওয়া যেতে পারে? আলুসেদ্ধ-ভাত? সে-সব তুই বাড়ি গিয়ে খাস। আপাতত বার্গার আমাকে টানছে।বলেই একটা ফার্স্ট ফুডের কাউন্টারে দুটো বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস আর কোল্ড ড্রিঙ্কস অর্ডার করে অর্ক বলে, “আরাম করে খেয়ে নে। এখনও প্লেন ছাড়তে ঢের দেরি। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কিছুই তো খাসনি!

খাবারের ট্রে নিয়ে টেবিলে এসে বসে অর্ক। চিকেন বার্গারে বিশাল এক কামড় বসিয়ে সে দেখে চুপচাপ বসে আছে রিয়া, খাবারে মন নেই তার। অর্ক চিন্তিত মুখে বলে, “কী রে? খাচ্ছিস না যে! দ্যাখ, আলুসেদ্ধ-ভাত মার্কা স্বাস্থ্যকর খাবার এখানে তোকে কেউ দেবে না। না খেতে চাইলে অবশ্য আমার মতো সর্বভুক এখানেই হাজির।

অনেকদিন থাকা হয়ে গেল কলকাতায়। মন তো একটু খারাপ হয়েই যাচ্ছে। তবে অনেক কিছু শিখে নিলাম এবার তোমার কাছ থেকে।

নো সেন্টিমেন্ট প্লিজ! এবার হাত লাগা দেখি। মুখ দেখে মনে হচ্ছে এখনই কেঁদে ফেলবি। চোখের জল কোল্ড ড্রিঙ্কসে মিশে গেলে খুব একটা খেতে ভালো লাগার কথা নয় কিন্তু।অর্ক চোখ বুজে বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস চিবোতে থাকে

চারজনের জন্য নির্দিষ্ট যে টেবিলে মুখোমুখি বসে অর্করা খাচ্ছিল, সেই টেবিলে একটা চেয়ার খালি। আর একটা চেয়ারে একজন প্রৌঢ় সর্দারজি মন দিয়ে তাঁর হাতের বিশাল পটাটো চিপসের প্যাকেটের গায়ে ছাপা লেখাগুলো মন দিয়ে পড়ছিলেন। রিয়ার নজর সেইদিকে দেখে অর্ক বলে, “ইনিও মনে হয় তোর মতো স্বাস্থ্যকর খাবার খুঁজছেন…

অর্কর কথা শেষ না হতেই ভদ্রলোক একেবারে স্পষ্ট বাংলায় বলে ওঠেন, “একেবারেই তাই। প্রতি প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে স্বাস্থ্যের গল্প। হ্যাঁ, তবে তোমার আনা ওই খাদ্যগুলোতে লেখা থাকে না সে-সব। জিজ্ঞেস করলে কাউন্টারের ছেলেমেয়েগুলোও বলতে পারবে কি না জানি না।

অর্ক সর্দারজিকে পরিষ্কার বাংলায় কথা বলতে শুনে বেশ অপ্রস্তুত হয়। রিয়া মুখ ঘুরিয়ে হাসি চাপতে চেষ্টা করে। তার স্মার্ট দাদাটি হঠাৎ এই প্রৌঢ় ভদ্রলোকের কাছে অসময়ে ভুল কথা বলে বড়োই বিপদে পড়েছে। মনে মনে খুব খুশি হয় রিয়া। চোখের ভাষায় বলতে চেষ্টা করে, ‘আরও বাজে বকে যাও। ঠিক হয়েছে।

অর্ককে অপ্রস্তুত দেখে ভদ্রলোক মুখ খোলেন—কী সাহেব? আপনি কি লজ্জা পেলেন? চার পুরুষের বাস এই কলকাতায়। কিচ্ছু মনে করিনি। আসলে কী জানো, দিল্লির ফ্লাইটের অনেক দেরি। খাওয়াদাওয়ার অনেক বাধানিষেধ আছে আমার। হাইপারটেনশন, সুগার—কী নেই! ইচ্ছে করলেও অনেক কিছু খেতে পারি না। এই দু-চারটে চিপস চিবিয়ে চিবিয়ে দিল্লি পৌঁছে যাব ঠিক। তারপর বাসায় গিয়ে সেই রোটি-সবজি কপালে। আমার গিন্নিও এখন ওখানেই, পুরো নার্সিং-হোমে থাকা যাকে বলে—কী আর করা যাবে? যাক গে, এই প্যাকেটে চিপস কোম্পানি কতটা শক্তি দেবে আমাকে তাই দেখছিলাম।

সর্দারজির কথায় একটু আশ্বস্ত হয়ে অর্ক বলে, “সরি ফর দ্য কমেন্ট স্যার? ভালোই হল, আপনিও দিল্লি যাচ্ছেন। আমরাও…

বাহে গুরু! তাহলে তো খুব ভালো হল। আমি দিল্লি-কলকাতা যাতায়াত করতে থাকি। দুটো জায়গাতেই আমার বাড়ি আছে। তা দিল্লির কোন জায়গাতে…

অর্ক আঙুল দিয়ে রিয়াকে দেখিয়ে বলে, “এই যে, এ হল দিল্লিওয়ালি। ওকেই জিজ্ঞেস করুন না হয়।

রিয়ার সঙ্গে সর্দারজির কথা চলতে থাকে। কে কোথায় থাকে জানাজানি হয়। হঠাৎ সর্দারজির হাতের প্যাকেটের দিকে ইশারা করে অর্ক জিজ্ঞেস করে, “প্যাকেটে শক্তি লেখা থাকে মানেএনার্জি’-র মাত্রা লেখা থাকে, সেটার কথা বলছিলেন? আমি তো জানতাম ওটা কোম্পানিগুলোর প্রোডাক্ট বিক্রি করার একটা চাল। কোনোদিন সিরিয়াসলি নিইনি। তাহলে ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতে হয় দেখছি।

মুচকি হেসে সর্দারজি বলেন, “খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বাজার থেকে আমরা যা কিনে এনে রান্না করি, সেগুলো প্যাকেটজাত নয়, কাজেই সেক্ষেত্রে শক্তি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সব খাবারেই থাকে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট আর ফ্যাট—এসব তো সবাই জানে। এই তিনটি উপাদান আমাদের শরীরে শক্তি জোগায়। সেই শক্তি খাবারে লুকিয়ে থাকে। খাবার খেলেই তো আর সঙ্গে সঙ্গে গায়ে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে না! খাবার পাকস্থলীতে গিয়ে হজম হয়ে সরল হয়। তারপর সেই সে-সব অন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের সব কোষে। কোষে অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ইত্যাদি পুড়ে যায়, আর আমরা শক্তি পাই।

অর্ক বোঝে, একেবারে পৌষ্টিকতন্ত্রের গোড়া থেকে বোঝাতে চান ভদ্রলোক, যা সব স্কুল পাঠ্য বিজ্ঞানের বইতে পাওয়া যায়। আলোচনা সংক্ষেপ করতে সে বলে, “এই প্যাকেটের ব্যাপারটা আমাদের দেশে মনে হয় খুব প্রাচীন নয়। প্যাকেটের খাবারে শক্তি উল্লেখ করাটা হয়তো বিদেশ থেকে আমদানি।

সর্দারজি অর্কর কথা শুনে খুশি হয়ে বলেন, “ঠিক ধরেছ। ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশে প্যাকেটবন্দি খাবার বিক্রি হয় অনেকদিন। সেখানে মানুষ আধুনিক হয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য সচেতন হতে থাকে। তখন প্যাকেটের খাবার খেলে দেহে কতটা শক্তি পাওয়া যেতে পারে, জানানোর হিড়িক পড়ে কোম্পানিগুলোর মধ্যে। আমাদের দেশও কেন পিছিয়ে থাকে? প্রথম প্রথম বহুজাতিক সংস্থাগুলো ভারতের বাজারে প্যাকেটজাত খাবার বিক্রি শুরু করে। ক্রমশ ভারতের কোম্পানিগুলোও এই একই রাস্তা ধরে। ভারতে প্যাকেটের খাবারের চাহিদা প্রচুর। আজকাল চাল, ডাল থেকে শুরু করে মাখন, ঘি বা চিনি সবই প্যাকেটে ভরে বিক্রি হয়। কাজেই প্যাকেটের উপর খাবারের পরিচয়পত্র না দিলে লোকে কিনবে কেন?” চিপসের প্যাকেট দেখিয়ে সর্দারজি বলেন, “কিন্তু প্যাকেটের খাবারে কতটা শক্তি লুকিয়ে আছে সেটা পরীক্ষাগারে হিসেব করে বার করতে হয়। এর জন্য খাবারকে একটা বিশেষ যন্ত্রের মধ্যে রেখে পুড়িয়ে শক্তির পরিমাপ করা হয়ে থাকে। একে বলা হয়বম্ব ক্যালরিমিটারপদ্ধতিটা একটু জটিল, কিন্তু বোঝার বাইরে নয়।

রিয়া মুখ খোলে, “ক্যালরিমিটার জানি। শক্তির পরিমাপ করার জন্য ব্যবহার হয়। এতে যে-কোনো বস্তু রেখে অক্সিজেনের সংস্পর্শে পুড়িয়ে ফেললে ক্যালরিমিটারের জল গরম হয়ে যায়। তাপমাত্রার পার্থক্য বার করতে পারলেই কতটা তাপশক্তি আছে হিসেব করে বার করে ফেলা যায়।

ভেরি গুড গার্ল! ভেরি ইনটেলিজেন্ট ইন ডিড! কোন ক্লাস তোমার?”

সর্দারজি রিয়ার পড়াশুনোর কথা জেনে খুশি হন। তাকে উচ্চশিক্ষা নেবার জন্য একজন দাদুর ভূমিকায় উৎসাহ দিতে থাকেন

প্রসঙ্গ ঘোরাতে অর্ক বলে, “এবার প্লেন ছেড়ে যাবে। তোর ফিজিক্সের বম্ব অন্তত এখন ফেলিস না।”  কিন্তু আবার সে সর্দারজিকে প্রশ্ন করতে ছাড়ে না—সবসময়ই কি বম্ব-ক্যালরিমিটার দিয়ে খাবারের শক্তি পরীক্ষা করে দেখে কোম্পানিগুলো?”

না, তা নয়। এর জন্য একটা ফর্মুলা ব্যবহার করে তারা—চার চার নয়ফর্মুলা।বলেন সর্দারজি

আবার অঙ্কের ফর্মুলা? ওরে ব্বাবা, এয়ারপোর্টে এসেও অঙ্ক পিছু ছাড়ে না, ভাবে অর্ক


 

প্রৌঢ় বুঝি অর্কর মনের কথা পড়ে ফেলেন।—খুব সহজ উপায়। এক গ্রাম প্রোটিনে চার ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায় প্রতি গ্রামে। জুল শক্তির একক তা তোমাদের মতো বুদ্ধিমান লোকেরা জানে। এক গ্রাম কার্বোহাইড্রেট পুড়িয়ে পাওয়া যায় সেই চার জুল। কিন্তু এক গ্রাম ফ্যাট পোড়ালে পাওয়া যাবে আট জুল। তাই খাবার প্যাকেটে ভরার আগে কোম্পানির ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করে জেনে নেয় আনুমানিক কত গ্রাম প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট আর ফ্যাট আছে। ধরা যাক একটা চিকেন নাগেটসের প্যাকেটে আছে ১১ গ্রাম প্রোটিন, ২৫ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট আর ৫ গ্রাম ফ্যাট। তাহলে মোট শক্তি কত হবে? ১১ x ৪ + ২৫ x ৪ + ৫ x ৯ = ১৮৯ ক্যালরি। তবে এটা আনুমানিক হিসেব। কোম্পানি লিখবে ১৯০ বা ২০০ ক্যালরি।

কিন্তু এই শক্তির সব যদি ঠিকঠাক পোড়ানো না যায়, তবে বিপদ আছে। সব শক্তি তাহলে জমা হয় শরীরে, বৃদ্ধি পায় মেদ।মন্তব্য করে অর্ক

বেড়ে যায় ভুঁড়ি, এই যেমন আমার। একেবারে ঠিক বলেছ।

সর্দারজি কথাটা বলতেই তিনজনে হেসে ওঠে একসঙ্গে

রিয়া বলে, “ব্যায়াম করলে ক্যালরি খরচ হবে, তাহলে তো চিন্তা নেই।

একদমই তাই। এইজন্য আমি সকালে উঠে চার কিলোমিটার হাঁটি রোজ। তোমাদের বয়স অল্প। একটু-আধটু বাড়ির কাজ আর খেলাধুলো করলে শক্তি খরচ হবে, শরীর থাকবে ফিট।

সর্দারজি হাতের স্মার্ট ওয়াচে সময় দেখেন। তখনই বোর্ডিং শুরু হবার ঘোষণা হয় মাইকে। ওরা তিনজনই উঠে পড়ে। সর্দারজি একই ফ্লাইটে দিল্লি চলেছেন। রিয়া জেনে নিয়েছে দিল্লিতে তিনি রিয়াদের বাড়ি থেকে খুব দূরে থাকেন না। কাজেই অর্ক আর রিয়ার নেমন্তন্ন হয় তাঁর বাড়ি। প্রৌঢ় এবার হিন্দিতে রিয়াকে বলেন, “হমারে ঘর জরুর আনা বেটি। মিলেগি সর্সোঁ দা সাগ, মক্কে কা রোটি, সাথ মে বাটার-চিকেন। আয়েগি ন?”

রিয়া বলে, “সে আর বলতে আংকল? এই যে আমার দাদাটিকে দেখছেন না, এক নম্বরের পেটুক। না নিয়ে গেলে আমাকেই জ্বালিয়ে খাবে। চলুন একসঙ্গে যাওয়া যাক।

অর্ক বাটার-চিকেনের নাম শুনে খুশি হয়ে বলে, “জরুর আয়েঙ্গে প্রাজি! আর আপনি বেশ গপ্পে লোক। একদিন আড্ডা দিতে যাবই।

সর্দারজি অর্কর পিঠ থাবড়ে দেন প্লেনের ভিতরে শরীর গলিয়ে দিয়ে

(ক্রমশ)

 

<

আরও পড়ুন  -








 

চিপস নয় তো চিপ

 

পাখিদের জি পি এস 


আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো

 

 ইনডাকশন কুকারের কেরামতি


 অন্ত্র তো নয় যন্ত্র


 খাবারের গায়ে কেন টক টক গন্ধ


 জল শুধু জল


 ফ্রাই, কিন্তু ড্রাই নয়


 যার নুন খাই, তার গুণ গাই


 কুসুমে কুসুমে